উসকানি-অনুভূতিতে আঘাত কোনটা?

উদিসা ইসলাম ২১:৩৩ , মে ১৫ , ২০১৯

অনুভূতিতে-আঘাতবরিশালে খ্রিষ্টান ধর্মযাজক ফাদার লাকাবা লিএল গোমেজ বাদী হয়ে মঙ্গলবার (১৪ মে) দুপুরে কবি হেনরী স্বপনসহ তিন জনের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় হেনরী স্বপনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এদিকে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে সাম্প্রদায়িক উসকানির অভিযোগে ২০১৭ সালে দায়ের করা এক মামলায় বুধবার (১৫ মে) সকালে আইনজীবী ইমতিয়াজ মাহমুদকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এই দুই দিনে দুজনকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় গ্রেফতারের পর অনুভূতি’তে আঘাত কিংবা ‘উসকানি’ কারা কখন বোধ করবেন, তা আইনে স্পষ্ট থাকা না থাকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
আইনজীবীরা বলছেন, ধর্মীয় অনুভূতি বলতে কী বোঝানো হচ্ছে, তা কোনও আইনেই স্পষ্ট করা হয়নি। কার কোন কথায় কে আঘাত পাচ্ছেন, সে বিষয়েও কিছু বলা না থাকায় সেই সুযোগটা অনেকে নেন। আর অ্যাক্টিভিস্টরা বলছেন, কোনও বক্তব্যের বিরুদ্ধে চট করে উসকানির অভিযোগ আনা বাকস্বাধীনতাবিরোধী।

মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবীরা শুরু থেকেই আশঙ্কা করেছিলেন, আইসিটি অ্যাক্টের ৫৭ ধারা সমালোচনার মুখে বিলুপ্ত হলেও নতুন আইন ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের মধ্যে ৫৭ ধারার সব উপাদান থাকতে পারে এবং মামলা দায়েরের প্রবণতা বাড়বে। আশঙ্কা ঠিক প্রমাণ করে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে আইনটি পাস হওয়ার পরের মাসে প্রথম দুই সপ্তাহে ১৩টি মামলার নজির সৃষ্টি করে।

 এই আইনের মামলার সংখ্যা সম্পর্কে জানতে চাইলে সাইবার ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) নজরুল ইসলাম শামীম বলেন, ‘প্রায় ৪০টি মামলা বিচারাধীন আছে। আর প্রায় আড়াইশ মামলা তদন্তনাধীন।’

ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টে বলা হয়েছে, ‘যদি কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে বা জ্ঞাতসারে ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত করিবার বা উসকানি প্রদানের অভিপ্রায়ে ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা প্রচার করেন বা করান, যাহা ধর্মীয় অনুভূতি বা ধর্মীয় মূল্যবোধের উপর আঘাত করে, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ। যদি কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১)-এর অধীন কোনও অপরাধ সংঘটন করেন, তাহা হইলে তিনি অনধিক ৫ (পাঁচ) বৎসর কারাদণ্ডে বা অনধিক ১০ (দশ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।’

এদিকে, দণ্ডবিধির ২৯৫ থেকে ২৯৮ ধারায় মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, উপাসনালয় ভাঙচুরের বিষয়ে ব্যাখ্যা দেওয়া আছে এবং শাস্তির বিধান উল্লেখ থাকলেও কী কী কারণে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগ আনা যেতে পারে, তা পরিষ্কার করে বলা নেই। ধর্মীয় অনুভূতির সংজ্ঞা কী হবে, সে বিষয়েও স্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি। ধর্মীয় অনুভূতির কোনও সংজ্ঞা এখনও দেশের প্রচলিত আইনে অস্পষ্ট রয়ে গেছে।

অনুভূতিতে আঘাত আপেক্ষিক বিষয়, একে সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা কঠিন উল্লেখ করে শোলাকিয়া ঈদগাহের খতিব ফরীদ উদ্‌দীন মাসঊদ বলেন, ‘কার কখন অনুভূতিতে আঘাত লাগে, সেটা বলা মুশকিল। এক ভাইয়ের যে বিষয়ে আঘাত লাগছে, আরেক ভাই সেটাকে আঘাতপ্রাপ্ত নাও হতে পারেন। তবে ধর্মীয় বিষয়ে কটাক্ষ করলে অনুসারী যে কারও আঘাত লাগতে পারে। কার কোথায় আঘাত লাগে, আইনে তা সুনির্দিষ্ট করলে ভালো হবে। কিন্তু বিরাট সমস্যাও হতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আইনে তার ব্যাখ্যা থাকলে সুবিধা হতো। ধর্মগুরুদের পরামর্শক্রমে কোন কোন বিষয়ের ক্ষেত্রে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত বিবেচনা করা হবে, তার একটি নির্দেশনা তৈরি করা যেতে পারে।’

এই প্রসঙ্গে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, ‘কখনোই আইন এটিকে স্পষ্ট করেনি। এই সুযোগে কিছু মানুষ ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের বিষয়টিকে ব্যবহার করে বিরোধী পক্ষকে ঘায়েল করে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে ধর্মের ব্যাপারে মানুষ যতটা না পালনে উদ্যোগী, তার চেয়ে বেশি উদ্যোগী সেটি নিয়ে এক ধরনের সাম্প্রদায়িক পরিবেশ তৈরিতে। যেটি দিয়ে অন্য মানুষের ক্ষতি করা যায়। আইনের দুর্বল দিকের জন্য সমাজের কিছু মানুষ অন্য মানুষের ব্যাপারে এই টার্মটি প্রয়োগ করছে। সেক্ষেত্রে ডিজিটাল আইনের ব্যবহার ব্যাপকহারে হচ্ছে।’

যতটা না একজন ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি ধর্ম বুঝে অবমাননার অভিযোগ নিয়ে আইনের আশ্রয় নিচ্ছেন, তার চেয়ে বেশি মামলা হচ্ছে প্রতিপক্ষকে হয়রানি করতে। মামলা পরিচালনার অভিজ্ঞতা থেকে ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের দেশে ধর্মীয় অনুভূতি বলতে কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের অনুভূতিই বোঝানো হয়ে থাকে। কার কখন অনুভূতিতে আঘাত করবে, সেটার ওপরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতে পারে না। এ ধরনের ক্ষেত্রে আরও তদন্ত ও তথ্য সংগ্রহের পর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা থাকলে আরও বেশি স্বস্তিকর হতো।’

ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া আরও বলেন, ‘ধর্ম পালনকারী ও সমালোচনাকারী উভয়েই কট্টর হওয়ায় বর্তমানে এক অসহিষ্ণু ব্যবস্থার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি। এখান থেকে কোনও ধরনের আইনি কাঠামোর মধ্যদিয়ে পরিত্রাণ পাওয়া খুব সহজ নয়।’

আইনটি অন্যকে হয়রানি করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল মন্তব্য করে অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট আরিফ জেবতিক বলেন, ‘‘সাধারণ আইনে হয়রানি করতে চাইলে যতক্ষণ কেউ চুরি না করছে, ততক্ষণ চোর বানাতে পারছি না। কিন্তু ‘অনুভূতি’ ও ‘উসকানি’র মতো শব্দগুলো দিয়ে এসব আইনের মাধ্যমে ওই জিঘাংসা প্রকাশ করতে পারা যায় সহজেই।’’ তিনি বলেন, ‘২০১৩ শাহবাগের গণবিস্ফোরণের পরে তরুণ সমাজ ও তাদের সাইবার জগতের সক্ষমতা সম্পর্কে জেনেই এই আইনটি প্রস্তুত করা হয়। সরকারকে তোষামোদ করার মানসিকতা থেকে একশ্রেণির মানুষ বিভিন্ন সময়ে এই আইনের অধীনে মামলা করতে থাকে।’ এর মধ্যে ৫৭ ধারাটি একেবারেই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত-হয়রানিমূলক বলেই সরকার দ্রুত তা বাতিল করতেও বাধ্য হয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

 

/এমএনএইচ/

x