নিজ জমিতে স্কুল, স্ত্রীর নামে আছে ফ্ল্যাট আগেও ৪০ মাস বরখাস্ত ছিলেন দুদক কর্মকর্তা বাছির

দীপু সারোয়ার ১৮:৪২ , জুন ১১ , ২০১৯




এনামুল বাছির (ছবি: সংগৃহীত)দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে এর আগেও একবার ৪০ মাস সাময়িক বরখাস্ত ছিলেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছির। তখন ৩৫০ কোটি টাকা উদ্ধার সংক্রান্ত একটি মামলার তদন্তের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। তদন্তে অসততার অভিযোগ উঠলে তাকে বরখাস্ত করা হয়। তবে পরে পরিস্থিতি সামলে উঠে চাকরিতে পুনর্বহাল হন তিনি, পান পদোন্নতি।

পুলিশ কর্মকর্তা ডিআইজি মিজানুর রহমানের দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান, তথ্য ফাঁস ও ঘুষ লেনদেনের ঘটনায় বিতর্কিত এ কর্মকর্তা নিজের নামে কোনও সম্পদ নেই বলে দাবি করেছেন।

তবে বাংলা ট্রিবিউনের অনুসন্ধানে তার নামে রাজধানীর মেরাদিয়ায় ৬ শতাংশ জমির ওপর স্থাপিত একটি স্কুলের সন্ধান মিলেছে। এছাড়া তার স্ত্রী নামে উত্তরায় একটি ফ্ল্যাট রয়েছে বলেও তথ্য পাওয়া গেছে।

স্ত্রী রুমানা শাহীন শেফা মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। এনামুলের দাবি, তার এবং স্ত্রী শেফার সার্ভিস অ্যাকাউন্টের বাইরে কোনও ব্যাংক হিসাব নেই। তবে অনুসন্ধানে রুমানা শাহীন শেফার নামে সার্ভিস অ্যাকাউন্টের বাইরে সোনালী ব্যাংকে এবং বাছিরের নামে এক্সিম ব্যাংকে দু’টি ব্যাংক হিসাবের তথ্য পাওয়া গেছে।

এদিকে অসততার অভিযোগে আগেও ৪০ মাস সাময়িক বরখাস্ত থাকার বিষয়টি বাংলা ট্রিবিউনের কাছে স্বীকার করেছেন খন্দকার এনামুল বাছির।

তিনি বলেন, ‘দুর্নীতি দমন ব্যুরো থেকে যখন দুর্নীতি দমন কমিশন হলো, তখন ৪০ মাস চাকরি ছিল না। ব্যুরো আমলে আমি একটা মামলা তদন্ত করেছিলাম, তাতে ৩৫০ কোটি টাকা রিকভার হয়েছিল। সেই সময়ে বিবাদী পক্ষ ব্যুরোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সর্বনিম্ন পর্যায় পর্যন্ত কিনে ফেলে। তারা আমাকে ঘরে পর্যন্ত ঘুমাতে দেয়নি। কিছু দিন পর পর আমার কর্মস্থলও পরিবর্তন করা হতো। যখন কমিশন হয় তখন আমাকে অবহেলা করা হয়েছিল। আমার কাছে এবারের অভিযোগ নতুন কিছু না।’

প্রসঙ্গত, ২০০৪ সালের ২১ নভেম্বর দুর্নীতি দমন ব্যুরোর নাম হয় দুর্নীতি দমন কমিশন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে তৎকালীন পিজি থেকে (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়) শরীরবিদ্যায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন খন্দকার এনামুল বাছির, তার পড়াশোনা শেষ হয় ১৯৮৮ সালে। ১৯৯১ সালে তিনি দুর্নীতি দমন ব্যুরোতে যোগ দেন। পরিচালক হওয়ার আগে দুদকের আইন বিভাগের উপ-পরিচালকও ছিলেন তিনি। তার চাকরির মেয়াদ আছে আরও তিন বছর।

ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনসহ নানা দুর্নীতির অভিযোগে অনুসন্ধান চালায় দুদক। গত মাসে ওই অনুসন্ধান প্রতিবেদন জমাও দেওয়া হয়। অনুসন্ধান করেন দুদক কর্মকর্তা এনামুল বাছির। সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে ডিআইজি মিজান অভিযোগ করেন, দুর্নীতির অভিযোগ থেকে বাঁচতে এনামুল বাছিরকে দু’দফায় ৪০ লাখ টাকা ঘুষ দিয়েছেন তিনি। আর ওই ঘুষ লেনদেনের বিষয়ে কথোপকথনের অডিও প্রকাশ করেন ডিআইজি মিজান। ঘুষ নেওয়া ও তথ্য ফাঁসের অভিযোগ ওঠার পর দুদক কর্মকর্তা বাছিরকে সাময়িক বরখাস্ত করে দুদক। আর ডিআইজি মিজানের ঘুষ দেওয়ার ঘটনা নজরে আসায় খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ সদর দফতর।
তবে ডিআইজি মিজানের সঙ্গে কথপোকথনের অডিও রেকর্ডটি ‘ম্যানুফ্যাকচারিং’ এবং মিথ্যা দাবি করেছেন খন্দকার এনামুল বাছির। তিনি বলেন, ‘এটা ডিজিটাল জালিয়াতি’। তিনি বলেন, ‘ডিআইজি মিজান সবসময় নিজেকে ‘আনটাচেবল’ মানুষ মনে করেন। তার দুর্নীতির অনুসন্ধান ও তদন্ত হোক, সেটা তিনি চাননি। হুমকি-ধমকিতে যখন কাজ হয়নি তখন মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছেন। দুদক এবং আমাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চেয়েছেন ডিআইজি মিজান।’ বিভিন্ন ঘটনায় ডিআইজি মিজান নানাজনকে টুকরো টুকরো করে হত্যার হুমকিও দিয়েছেন দাবি করে বাছির বলেন, ‘যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খোঁজ করলেই পাওয়া যাবে।’

দুদক কর্মকর্তা বাছিরের দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে ডিআইজি মিজান বলেন, ‘আমি চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি অডিও কথোপকথনটি বাছিরেরই। সে যা-ই দাবি করুক তাতে কিছু যায় আসে না। প্রযুক্তিগত যত পরীক্ষা-নিরীক্ষা হোক তাতেও অডিও কথোপকথনটি যে বাছিরের তা-ই প্রমাণিত হবে।’

ঘুষ লেনদেনের বিষয়টি শুধু কী বাছিরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, নাকি আরও কেউ জড়িত আছে- এ প্রশ্নের জবাব দেননি ডিআইজি মিজান।
খন্দকার এনামুল বাছিরের বিরুদ্ধে আরেকটি অভিযোগ হলো, তিনি ৩০ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে স্ত্রী শেফাকে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ বানাতে চেয়েছিলেন। শেফাকে অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পরিষদের চার সদস্য নিয়ে একটি নিয়োগ কমিটিও গঠিত হয়। তবে নিয়োগ নিয়ে ৩০ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ উঠলে গত ২৯ এপ্রিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিভাগ নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত করে। গঠন করা হয় তদন্ত কমিটি। বিষয়টি এখন তদন্তাধীন রয়েছে।

আরও পড়ুন:
ঘুষের অডিও বানোয়াট: দুদক পরিচালক এনামুল বাছির

আমার কাছে সব রেকর্ড আছে: ডিআইজি মিজান

/টিটি/এমওএফ/

x