প্রতারণা করতেই প্রতিষ্ঠিত হয় ‘রয়্যাল চিটার্স ডেভেলপমেন্ট’

শেখ জাহাঙ্গীর আলম ১০:২৮ , জুন ২৬ , ২০১৯

র‌্যাবের হেফাজতে আটক প্রতারকচক্রের কয়েকজন

প্রতারণায় সিদ্ধহস্ত বারেক হাজি তার চ্যালাচামুন্ডাদের নিয়ে প্রতিষ্ঠা করে ‘রয়্যাল চিটার্স ডেভেলপমেন্ট’ বা আরসিডি। ‘অভিজ্ঞ’ প্রতারকরাই কেবল এর সদস্য হতে পারে। গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, এই সংগঠনের প্রায় অর্ধশত সদস্য রয়েছে। সংগঠনভুক্ত এই প্রতারকরা দেশের বিভিন্ন স্থানে শত শত মানুষের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এরই মধ্যে প্রধান প্রতারক বারেক হাজিসহ চক্রের বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব-৪)।

গ্রেফতার প্রতারকদের জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, সাধারণ মানুষকে ঠকিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে আরসিডি প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই সংগঠনে তারাই আসতে পারতো, যারা প্রতারণাকে পেশা হিসেবে মনে করতো।

র‌্যাব-৪-এর অপারেশন অফিসার (সিনিয়র এএসপি) মোহাম্মদ সাজেদুল ইসলাম সজল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে বেশ কয়েকটি গ্রুপের অনেককে গ্রেফতার করেছি। বর্তমানে তারা কারাগারে রয়েছে। এসব গ্রুপের আরও কিছু সদস্য পলাতক রয়েছে। তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।’

এই প্রতারকচক্রের কবলে পড়ে নিঃস্ব হওয়া ব্যক্তিরা বারেক হাজিসহ প্রত্যেকের কঠোর শাস্তি দাবি করেছেন।

২০১৮ সালের জুলাইয়ে প্রতারক বারেক হাজির খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব খোয়ান সিরাজগঞ্জের কাপড় ব্যবসায়ী মুকুল মোকাদ্দেস ব্যাপারী। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শাড়ি-লুঙ্গি তৈরির কাঁচামাল সরবরাহের কথা বলে তিন দফা সাড়ে ১৬ লাখ টাকা নেয় তারা। এরপর ওই অফিসে গেলে নানা হুমকি দিয়ে আমাকে বের করে দেয়। পরদিন থেকে অফিস বন্ধ, সবার মোবাইল বন্ধ।’

তিনি বলেন, ‘দাড়ি-টুপি পরা বয়স্ক একজন মানুষ বারেক হাজী, সে আমার ১৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করছে। এখানে আমার জমানো, ব্যবসার টাকা এবং আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে ধার করেছিলাম। সব হারিয়ে আমি দুই মাস অসুস্থ ছিলাম। পরে মিরপুরের র‌্যাব-৪-এ অভিযোগ করি। উত্তরায় অভিযান চালিয়ে ৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়। বারেক হাজি আমাকে রাস্তার ফকির করে দিয়েছে।’ তিনি এই প্রতারকদের কঠোর শাস্তি দাবি করেন।

অপর ভুক্তভোগী মো. ইফতেখার উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘২০১৮ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ওই কোম্পানির বস তাদের আগারগাঁওয়ে অফিসে যেতে বলেন। এরপর সেখানে যাওয়ার পর আবেগময় গল্প বলে এবং প্রলোভন দেখায়। ভুলিয়ে-ভালিয়ে আমাকে অংশীদার বানিয়ে ফেলে। এরপর দফায় দফায় প্রতারক মাসুদুর রহমান, আজাদ ও জলিলকে ৩৫ লাখ টাকা দিই। তারা জানায়, ওই টাকা দিয়ে কেমিক্যাল পণ্য কিনেছে এবং তা সিআইডি আটক করেছে। এরপর থেকে তাদের সবার ফোন নম্বর বন্ধ।’

তিনি বলেন, ‘প্রতারিত হওয়ার পর আমি ছয় মাস দেউলিয়া হয়ে বিভিন্ন জায়গা আত্মগোপন করেছিলাম। কারণ, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে টাকা ধার করেছিলাম, তারা তাগাদা দিতো। পরে জায়গা-জমি, গয়না বিক্রি করে ১৬ লাখ টাকা শোধ করেছি। এখনও অনেকেই টাকা পায়। চাকরি করে ওই টাকা পরিশোধ করার চেষ্টা করছি। ওরা আমাকে নিঃস্ব করে পথে বসিয়ে দিয়েছে।’

একইভাবে নরসিংদীর পলাশের ঘোড়াশাল এলাকার রোখসানা আখতারের বাড়ির ছাদে ইন্টারনেট টাওয়ার স্থাপনের জন্য অ্যাডভান্স ২০ লাখ ও মাসিক ভাড়া ৪০ হাজার টাকা দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে তার ছোট ভাইয়ের কাছ থেকে ৩৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় বারেক হাজির লোকজন।

চক্রের অন্য একটি টিম সরকারি চাকরি দেওয়ার ফাঁদ পেতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাঁধনচকের আদিনা কলেজ এলাকার মো. বাদল, তার শ্যালক আতিকুল, বন্ধু মামুনের কাছ থেকে ২৪ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়।

প্রতারণার শিকার মুকুল ব্যাপারী, ইফতেখার, বাদল ও আতিকুলের মতো বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগীর অভিযোগের ভিত্তিতে র‌্যাব-৪ এই প্রতারকচক্রের সদস্যদের গ্রেফতার করেছে। গত জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত রাজধানীর মিরপুর, উত্তরা, পল্লবী, দারুসসালাম, খিলক্ষেত, রামপুরা এলাকা থেকে প্রতারণার সঙ্গে জড়িত ৮৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

র‌্যাব জানায়, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে প্রতারক বারেক সরকার ওরফে বারেক হাজিসহ ৫ জনের একটি গ্রুপকে গ্রেফতার করা হয়। দীর্ঘ ৪৩ বছর সে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রতারণা করে আসছিল।

র‌্যাব-৪-এর কর্মকর্তারা জানান, ১৯৫৬ সালে কুমিল্লার দাউদকান্দি থানার বাহেরচর গ্রামে বারেকের জন্ম। পঞ্চম শ্রেণিও পাস করেনি সে। ১৯৭৪ সালে তাকে সৌদি আরব পাঠায় পরিবার। তবে সেখানে তেমন সুবিধা করতে না পারায় দুই বছর পর (১৯৭৬ সাল) দেশে ফিরে আসে। এরপর শুরু করে প্রতারণা। রাজধানীর বিভিন্ন প্রতারকচক্রের সদস্যরা তাকে গুরু মানে।

গ্রেফতার প্রতারকদের জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, সাধারণ মানুষকে ঠকিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে ‘রয়েল চিটার্স ডেভেলপমেন্ট’ (আরসিডি) প্রতিষ্ঠা করে বারেক। এই সংগঠনে তারাই আসতে পারতো, যারা প্রতারণাকে পেশা হিসেবে মনে করতো।

র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের উপপরিচালক মেজর হুসাইন রইসুল আজম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রতারকদের গ্রেফতারের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনতে র‌্যাব কাজ করছে। প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষ প্রতারণার শিকার হচ্ছে। তবে আমরা অভিযোগের ভিত্তিতে গোয়েন্দা নজরদারি করে প্রতারকদের গ্রেফতারে অভিযান পরিচালনা করছি।’

 

/এইচআই/এমএমজে/

x