পশ্চিম বাংলায় ‘বাংলা’ নিয়ে হচ্ছেটা কী!

উদিসা ইসলাম ০৮:০০ , জুলাই ১০ , ২০১৯

 ‘বাংলা পক্ষ’ নামে সংগঠনের ফেসবুক পেজভারতের পশ্চিমবঙ্গে বাংলার অধিকার আদায়ের দাবিতে, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বাংলায় পরিষেবা নিশ্চিত করার আন্দোলনে নেমেছে ‘বাংলা পক্ষ’ নামে একটি সংগঠন। ইতোমধ্যে তারা বাংলাদেশ ও এর রাজনীতিকে সামনে এনে ভাষার ভিত্তিতে রাজ্যের গুরুত্ব নিয়েও আলাপ তুলেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সাংবাদিকরা। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, এতদিনে এসে কোন বাস্তবতায় বাংলা নিয়ে নতুন করে আন্দোলন করতে হচ্ছে? পশ্চিম বাংলায় বাংলা নিয়ে আসলে হচ্ছে কী?

‘বাংলা পক্ষ’-এর সমর্থকদের দাবি, তাদের সংগঠন অরাজনৈতিক। যখন ভাষা অর্থ কেবল ভাষা নয়, যখন ভাষা রুজির সঙ্গে, ভাতের সঙ্গে সম্পর্কিত, তখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার আগে যে আন্দোলনের সূচনা, সেটি ‘বাংলা পক্ষ’।

তবে বাংলাদেশি রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি মূলত হিন্দি আধিপত্য ঠেকানোর আন্দোলন। জাতি সমস্যা সমাধান না করতে পারার কারণে এতদিনে এসে এই আন্দোলন করতে হচ্ছে।

‘বাংলা পক্ষ’-এর আন্দোলনের বড় শক্তি তাদের ফেসবুক পেজ। ইতোমধ্যে পেজটিতে তারা বাংলার দাবিতে করা সব অভিযান লাইভ করেছেন, নিজেদের কথা বলেছেন।

ফেসবুক লাইভে সংগঠকরা বলছেন, দাবির সঙ্গে পেটের-ভাতের যোগ আছে। পশ্চিমবঙ্গে সব পরিষেবা বাংলায় বাধ্যতামূলক করতে হবে।

‘জয় বাংলা’ স্লোগান নিয়ে সংগঠকরা বলছেন, তারা হিন্দিভাষী বলে যা খুশি বলতে পারেন আর আরেকজন হিন্দিভাষী নন বলে সেটি পারবেন না, এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান। তাদের দাবি, যিনি বাংলায় লিখতে বলতে-পড়তে পারেন তিনি সাক্ষর, কেবল হিন্দি, ইংরেজি জানেন না বলে তার ফরম কেন অন্যজনকে দিয়ে পূরণ করাতে হবে?

সম্প্রতি ব্যাংকের পরিষেবা বাংলা করার দাবিতে হুগলি জেলায় ‘বাংলা পক্ষ’-এর তরফ থেকে চন্দননগর ব্যাংক অব বরদায় ডেপুটেশন দেওয়া হয়। দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ ছিল, ওই নির্দিষ্ট ব্যাংকে পরিষেবা বাংলায় দেওয়া হচ্ছে না। এমনকি কাস্টমার বাংলায় জিজ্ঞেস করলে তাকে হিন্দি বলতে বলা হতো। পরে ‘বাংলা পক্ষ’ সেই কর্মকর্তাকে প্রশ্ন করা হয় বিষয়টি নিয়ে এবং পুরো প্রক্রিয়াটি ফেসবুকে লাইভ করা হয়।

‘বাংলা পক্ষ’-এর অন্যতম সংগঠক ও শিক্ষক গর্গ চট্টোপাধ্যায় বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “বিবিধের মাঝে ঐক্যের যে আদর্শে ভারত গঠিত হয়েছিল, হিন্দি সাম্রাজ্যবাদ সেটাকে কুলষিত করার চেষ্টা করেছে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে নানা অহিন্দি জাতি তামিল-মারাঠিরা লড়াই করেছে এর বিরুদ্ধে। নানা কারণে বিশেষত বিশ্বমানবতার কারণে এই বাংলায় বাংলা ও বাঙালির অধিকারকে কেন্দ্র করে লড়াই ও প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি। কিন্তু দানা বাঁধছিল। পরবর্তীতে হিন্দি সাম্রাজ্যবাদ যখন আমাদের এই বাংলায় চাকরি, বাজার, পুঁজি, জমি দখল করার জায়গায় পৌঁছে গেছে, তখন দেয়ালে পিঠ ঠেকার আগে যে প্রতিরোধ শুরু হয়েছে তার নাম ‘বাংলা পক্ষ’।”

যারা হিন্দি বা ইংরেজি জানেন তাদেরও এই বাংলা না-জানা নিয়ে তৈরি সমস্যা ভোগাবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক আদমশুমারি অনুযায়ী ৮৩ শতাংশ বাঙালি বাংলা ছাড়া অন্য ভাষা জানে না।’

গর্গ চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির কাছে আমরা সাড়া পাচ্ছি। আবার অনেকে আছে যারা অনেক ভাষা জানার মাধ্যমে চালিয়ে নিতে পারছে, তাদেরও আমরা পাচ্ছি। কেননা, হিন্দি সাম্রাজ্যবাদ তো জাতিগত বিদ্বেষও শেখায়। ফলে তারা হিন্দি সাম্রাজ্যবাদের চোখে যখন কেবল বাঙালি মাছখেকো হিসেবে ধরা পড়ে, তখন তাদের সমর্থনও পাই।’

গর্গ চট্টোপাধ্যয়ের স্ট্যাটাসহিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিনিধি স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য ‘বাংলা পক্ষ’র শুরুর ইতিহাস টেনে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এটার সূত্রপাত ২০১৭ সালের দিকে যখন পশ্চিম বাংলায় ব্যাপকভাবে হুমায়ুন জয়ন্তী সেলিব্রেশন দেখা যায়, যা মূলত উত্তর ভারতের অনুষ্ঠান। সেসময় থেকে একটা অংশ বলতে শুরু করে যে, বিজেপি ২০১৩ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গে শক্তি সঞ্চয় করছিল, তাদের হাত ধরেই উত্তর ভারতীয় অনুষ্ঠানগুলো পশ্চিমবঙ্গে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।’

তিনি বলেন, “ঐতিহাসিকভাবে ঊনবিংশ-বিংশ শতকের বাংলা সাহিত্যে উত্তর ভারতকে ‘হিন্দুস্তান’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই সময়কার বাংলা সাহিত্যে ‘হিন্দুস্তান’ বলতে পশ্চিম বা উত্তর ভারতকেই বোঝানো হতো। ‘বাংলা পক্ষ’ এই ইতিহাসকে খুঁড়ে বের করে। একদল বলে, হিন্দুস্তানি সংস্কৃতি এসে বাংলা সংস্কৃতিকে শেষ করতে চাইছে। উল্টোদিকে আরেকটি অংশ বলে, ‘হিন্দুস্তান’ তো গোটা ভারতবর্ষ। বিতর্ক শুরু হয়ে যায়।”

তিনি বলেন, “ধারাবাহিকভাবে ‘বাংলা পক্ষ’ বলে আসছে, বাঙালি সংস্কৃতি ও উত্তর ভারতীয় সংস্কৃতি সম্পূর্ণ আলাদা। এক্ষেত্রে তারা বারবার পূর্ব বাংলার ইতিহাসকে তুলে ধরেছে। হিন্দুস্তান-বিরোধিতার অংশ হিসেবে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে দেখিয়েছেন। ‘বাংলা পক্ষ’-এর যারা আছেন, তারা বারবার বলছেন, একাত্তরের যে দেশ বিভাজন সেখানে বাঙালি মুসলমানরা দেশ বিভাজনের ধর্মীয় পরিচয়ের ওপরে ভাষাতাত্ত্বিক পরিচয়টাকে সামনে এনেছিল। এইটার মধ্য দিয়ে বাঙালি প্রমাণ করেছিল, বাঙালির কাছে ধর্মের চেয়ে ভাষার গুরুত্ব বেশি। এই বক্তব্য ধারাবাহিকভাবে তারা দিয়ে আসছে।”

বিজেপিকে ঠেকানোর জন্যই এই আওয়াজ বলে মনে করেন ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি যেভাবে প্রবেশ করেছে এবং হিন্দির যে আধিপত্য—এ দুই আগ্রাসনে পশ্চিমবঙ্গ বিপন্ন বোধ করছে। পশিচমবঙ্গ তাদের নাম যে ‘বাংলা’ করতে চেয়েছিল সেটাতেও কেন্দ্র রাজি হয়নি, এটা নিয়ে বিপদ দেখা দিয়েছে বাংলাভাষীদের। আবার আসামেও তারা বিতাড়িত হচ্ছে। কাজেই জাতীয়তাবাদী চেতনা গড়ে উঠছে বলে বাইরে থেকে, এখানে বসে আমাদের মনে হবে। যদিও আমার মনে হয়, এর সঙ্গে তৃণমূলের রাজনীতি জড়িত।”

এই উপমহাদেশ কখনও এক জাতির দেশ ছিল না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময়ও ১৭টি জাতি ছিল যাদের প্রধান উপাদান ভাষা। ওই জাতি সমস্যার সমাধান ভারতে তখন হয়নি এবং সেই সমস্যা পশ্চিমবঙ্গের লোক এখন বুঝতে পারছে। আমরা ৭১ সালে সমাধান করেছি, বাঙালি জাতীয়তাবাদের ওপর ভিত্তি করে রাষ্ট্র গঠন করেছি।’

এটা মোকাবিলা সহজ হবে না মন্তব্য করে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘কেননা, আগ্রাসন চলবে। এটাকে নিয়ে যেতে হবে পুঁজিবাদবিরোধী আন্দোলনে। সেইখানে নিয়ে না গেলে এর ভবিষ্যৎ নেই।’

/এইচআই/এমএমজে/

x