নাগরিকের অধিকার রক্ষায় মামলা করবে কে?

উদিসা ইসলাম ১০:০৩ , জুলাই ১২ , ২০১৯

 

বেশকিছু অধিকার সংরক্ষণ আইনে ভুক্তভোগী সরাসরি মামলা করতে পারেন না। তাদের অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত সাপেক্ষে মামলা করে কর্তৃপক্ষ। মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবীরা বলছেন, এতে করে ন্যায়বিচার পাওয়া থেকে বঞ্চিত হওয়ার সুযোগ আছে। যদিও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মামলার আগেই যদি ব্যক্তিকে তার ন্যায্য অধিকার দেওয়া যায়, সেক্ষেত্রে সরাসরি মামলার জটিলতায় না যাওয়া তার জন্যই ইতিবাচক।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, নিরাপদ খাদ্য আইন, দুর্নীতি দমন আইনসহ অধিকার সংশ্লিষ্ট বেশকিছু আইনে ভুক্তভোগীর সরাসরি মামলা করার বিধান নেই। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ এর অধীনে ফৌজদারি কার্যক্রমের সীমাবদ্ধতা অংশে বলা আছে—১. এই আইনের অধীন ভোক্তা-অধিকারবিরোধী কাজের অভিযোগে কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে কোনও মামলা সরাসরি দায়ের করা যাবে না। ২. কোনও ভোক্তা বা অভিযোগকারী মহাপরিচালক বা মহাপরিচালকের কাছ থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনও কর্মকর্তা অথবা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা তার কাছ থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে অভিযোগ দায়ের করতে পারবেন।

এদিকে, নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩ এর অভিযোগ ও মামলা দায়ের ৬৬ (১) অংশে বলা আছে— খাদ্য ক্রেতা, ভোক্তা, গ্রহীতা বা খাদ্য ব্যবহারকারীসহ যেকোনও ব্যক্তি এ আইনের অধীন নিরাপদ খাদ্যবিরোধী কাজ সম্পর্কে চেয়ারম্যান বা তার কাছ থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধি বা পরিদর্শকের কাছে লিখিতভাবে অভিযোগ জানাতে পারবেন। এ ধারার দ্বিতীয় অংশে বলা হয়েছে— চেয়ারম্যান বা তার কাছ থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনও কর্মকর্তা বা পরিদর্শক, এ আইনের অধীন যেকোনও অপরাধ সংঘটনের বিষয় অবহিত হওয়ার পর, প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে সংশ্লিষ্ট অপরাধের বিষয়ে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হলে, খাদ্য আদালতে মামলা দায়ের করবেন।

যিনি ভুক্তভোগী মামলা করার পূর্ণাঙ্গ অধিকার তার থাকা জরুরি উল্লেখ করে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক নূর খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ভুক্তভোগী সরাসরি মামলা করতে না পারলে, তার সেই অভিযোগের ক্ষেত্রে মামলা নেওয়া, বা না নেওয়া পুলিশের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভর করে। আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে এটি ভুক্তভোগীর জন্য স্বস্তিদায়ক বিষয় নয়।’ বিভিন্ন সময়ে পুলিশ অভিযোগ এফআইআর  হিসেবে না নিয়ে জিডি হিসেবে রেখে যেতে বলে। পরে তদন্ত করে তাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মামলা করে। ফলে ভুক্তভোগী তার মামলার অধিকার ভোগ করতে পারেন না।’

তিনি আরও  বলেন,‘অনেক ক্ষেত্রে পুলিশকেই মামলার কর্তৃত্ব যেভাবে দেওয়া আছে, তাতে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি তার ইচ্ছের প্রতিফলন সরাসরি দেখতে পান না বলে আমি মনে করি।’

নিরাপদ খাদ্য নিয়ে মামলা করার অভিজ্ঞতা আছে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিহাব উদ্দিন খানের।ভুক্তভোগীরা সরাসরি মামলা করতে না পারায়, কখনও কখনও তাদেরকে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হতে হয় উল্লেখ করে শিহাব উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ভুলে গেলে চলবে না অভিযোগের তদন্ত প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা থাকে সংশ্লিষ্ট সংস্থার হাতে। অনেক সময় যদি তদন্ত কর্মকর্তা প্রভাবিত বা নিষ্ক্রিয় হন, তাহলে ভুক্তভোগী ক্ষতিগ্রস্ত হন। নিজে মামলা করতে পারলে মনিটরিং সহজ ও নিশ্চিত করা যায়।’

তিনি বলেন, ‘অনেক সময় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির পক্ষে শেষ পর্যন্ত মামলার হয়রানি সহ্য করা, বা সেটা করতে গিয়ে যে পরিমাণ আর্থিক সক্ষমতা লাগে,তা থাকে না। কিন্তু সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি মামলা না করে অন্য কেউ করলে পরবর্তী প্রক্রিয়ায় ম্যানুপুলেশনের সুযোগ থেকে যায়। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে সামাজিক বাস্তবতা হলো সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা না থাকলে ম্যানেজ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সেক্ষেত্রে তিনি ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।’

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক মাসুম আরেফিন মনে করেন, যেহেতু ভোক্তাদের অভিযোগের ভিত্তিতেই তাদের অধিকার নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়, সেক্ষেত্রে মামলার মতো জটিল প্রক্রিয়া খুব কাজের নয়। তিনি বলেন, ‘এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ভোক্তাকে সরকার সুবিধা দিচ্ছে। তাকে হয়রানি থেকে মুক্তি দেওয়া হচ্ছে। যদি তিনি (ভোক্তা) মামলা করতেই চান, তাহলে অন্য আরও  আইন আছে, সেগুলোতে মামলা করুক। এখন পর্যন্ত কোনও অভিযোগকে আদালতে মামলা করা পর্যন্ত নিতে হয়নি উল্লেখ করে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘কেউ সরাসরি কোর্টে যেতে চাইলে যেতে পারেন। আমরা প্রতিকার দিতে পারছি। যেকোনও অভিযোগ ১৫/২০ দিনের মধ্যে নিস্পত্তি করতে পারছি।’

 

/এপিএইচ/

x