ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে ডেঙ্গু, হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকরা

জাকিয়া আহমেদ ২৩:২৬ , জুলাই ১৫ , ২০১৯

এডিস-মশা

গত মাসের (জুন) শুরুর দিকে রাজধানীর হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশুরোগীর জন্য পৃথক ব্যবস্থা করা হয়। শিশু ওয়ার্ডের ভেতরেই আলাদা করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয় ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের । তারা যেন অন্য রোগীদের সঙ্গে মিশে না যান সে জন্য এই ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু মাসের শেষ দিকে এই ব্যবস্থা আর ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। এত রোগী আসা শুরু হয় যে, ডেঙ্গু রোগীদের আর পৃথক করে চিকিৎসা দেওয়া যাচ্ছিল না। আর এ চিত্র কেবল হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের নয়, রাজধানী ঢাকার প্রায় প্রতিটি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালেই একই চিত্র। এসব হাসপাতালের চিকিৎসকরা বলছেন, এবার ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দুঃস্বপ্নের মতো। বিপুল পরিমাণ রোগী সামাল দিতে তাদের রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে বলেও জানান তারা।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন্স সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে জানা গেছে, ঢাকার সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় রোগী ভর্তি হয়েছেন ২১৪ জন। সরকারি হিসাবে এ পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যুর কথা বলা হলেও প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি বলেও জানান চিকিৎসকরা।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক চিকিৎসক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ।

সরকারি হিসাব বলছে, চলতি বছরের শুরুতে জানুয়ারি মাসে ডেঙ্গু রোগী ছিল ৩৮, ফেব্রুয়ারিতে ১৮, মার্চে ১৭, এপ্রিলে ৫৮, মেতে ১৯৩, জুনে ১ হাজার ৭৫৯ এবং জুলাইতে দুই হাজার ৪৬৬ জন।

বর্তমানে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আছেন ২২৬ জন, মিটফোর্ড হাসপাতালে ১২৬, শিশু হাসপাতালে ২৫, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ৯৬, হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতালে ৫৮, বারডেম হাসপাতালে ১২, রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে ৩০ জন, মুগদা হাসপাতালে ৫০ জন, পিলখানার বিজিবি হাসপাতালে ১৯ জন। এই হিসাবে কেবল সরকারি হাসপাতালেই ভর্তি আছেন ৪১৩ রোগী।

এদিকে, বেসরকারি হাসপাতালগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বর্তমানে ভর্তি আছেন ৪৫, ইবনে সিনা হাসপাতালে ২২, স্কয়ার হাসপাতালে ৩৯, সেন্ট্রাল হাসপাতালে ৭৬, কাকরাইলের ইসলামী ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপাতালে ৫৯, ইউনাইটেড হাসপাতালে ৭, খিদমাহ হাসপাতালে ৯, অ্যাপোলো হাসপাতালে ৩০, ইউনিভার্সেল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ২৭, সালাউদ্দিন হাসপাতালে ৩৫, পপুলার হাসপাতালে ২০ জনসহ ঢাকার ৩৬টি হাসপাতালে মোট ৪১৩ জন রোগী ভর্তি আছেন। আর এসব হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়েছেন ২০৪২ জন বলে জানায় স্বাস্থ্য অধিদফতরের কন্ট্রোল রুম।

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) সানিয়া তহমিনা বলেন, ‘এবারে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েছে। ঢাকা শহরের ৯৩ ওয়ার্ডে আমরা জরিপ চালিয়েছিলাম গত জানুয়ারিতে। তখনই এডিস মশার লার্ভা পেয়েছিলাম। এই লার্ভা থেকেই কিন্তু এডিস মশা জন্মাবে। আর সেটা উল্লেখযোগ্যই ছিল।’ তবে ডিএনসিসির চেয়ে ডিএসসিসিতে এডিস মশার লার্ভা বেশি পেয়েছিলেন বলেও তিনি জানান।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল, ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালসহ একাধিক হাসপাতালের বেশ ক’জন চিকিৎসক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চলতি বছরে ডেঙ্গুর ধরন বদলেছে। গত কয়েক বছরের তুলনায় এবারে প্রায় পাঁচগুণ বেশি রোগী ভর্তি হয়েছেন হাসপাতালগুলোতে। আর সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে গিয়ে এই হার কতটা বাড়বে, তা নিয়েও আতঙ্কিত তারা।

জানতে চাইলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. খান আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার ডেঙ্গু রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি। এটা হতে পারে হাসপাতালগুলো থেকে রিপোর্টিং ভালো হচ্ছে। মানুষ একদিনের জ্বর হলেও চিকিৎসকের কাছে আসছে। আর আরেকটি বিষয় হচ্ছে, এবার যারা দ্বিতীয়বারের মতো ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছেন, তারা বেশ বিপদে পড়ছেন। তাদের ‘ইমিউন সিস্টেম’ নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে। আর তখনই জটিলতা বাড়ছে। এ রকম অবস্থার জন্যও মানুষের বিপদ বেড়েছে।’

অধ্যাপক ডা. খান আবুল কালাম আজাদ আরও বলেন, ‘আমরা যদি সরকারি ব্যবস্থাপনায় চিকিৎসা দিতে পারি, তাহলে মানুষকে ঠিক কাউন্সেলিং করে ঠিক চিকিৎসাটা দিতে পারবো।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, ‘‘ডেঙ্গুতে ‘সয়লাব’ চারদিক। প্রতিদিন প্রচুর রোগী পাচ্ছি। এডিস মশা যদি নির্মূল না করা যায়, তাহলে এটা ঠেকানো যাবে না।’

আর মশার বংশবৃদ্ধি বাড়ছেই মন্তব্য করে অধ্যাপক ডা. আব্দুল্লাহ বলেন, ‘মাঝে মাঝেই বৃষ্টি হচ্ছে। সেখানেই এডিস ডিম দিচ্ছে।’ যে কারও জ্বর হলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের কাছে যেতে অনুরোধ করে তিনি বলেন, ‘‘বর্তমানে যেহেতু ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি, তাই যে কারণেই জ্বর হলে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে, পরামর্শ নিতে হবে। কারণ, ডেঙ্গু যখন ‘সিরিয়াস’ হয়ে যায় তখন তাকে বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ে’। তাই জ্বর হলেই অবহেলা না করে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পরামর্শও দেন তিনি।

/এমএনএইচ/এমওএফ/

x