‘কী যে সময় আইলো, মশার কামড়ে মানুষ মইরা যায়’

জাকিয়া আহমেদ ০১:১৪ , আগস্ট ১৩ , ২০১৯

‘গত ছয় দিন ধরে মেয়েকে নিয়া হাসপাতালে আছি। আমার আরও দুই ছেলে আছে, তাদের বাসায় রেখে এসেছি। স্বামী রিকশা চালায়। তিনি একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি এই সংসারে। আল্লাহ যে আর কতো আজাব দিবো কে জানে। কী এক সময় আইলো মশার কামড়ে মানুষ মইরা যায়।’
কথাগুলো বলছিলেন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ঢাকা শিশু হাসপাতালের ১৫ নাম্বার ওয়ার্ডে ভর্তি তিন বছর দুই মাস বয়সী কন্যা শিশুর মা নাজমা আক্তার।
জানা গেছে, আজ ঢাকা শিশু হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছে ৩০ শিশু। বর্তমানে ভর্তি আছে ১৫১ জন। এ পর্যন্ত এই হাসপাতালে পাঁচ শিশু মারা গেছে।
এ হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. শাহীন শরিফ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত তিন দিন ডেঙ্গুসহ সব ধরনের রোগী কম ছিল। কিন্তু আজ রোগীর সংখ্যা একটু বেড়েছে। এই হাসপাতালে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের পরই ডেঙ্গু সেল করা হয়েছিল। কিন্তু রোগী বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ করা হয়েছে। যেখানে রক্ত নেওয়া, ভর্তি হওয়া, টেস্ট রিপোর্ট নেওয়াসহ সব এক জায়গাতেই করা যাবে। এমনকি ভর্তি হতে আগে যে টাকা নিয়ে বিভিন্ন কাউন্টারে যেত হতো-সেই ঝামেলাও নেই । তবে এটা কেবল ডেঙ্গু রোগীদের জন্য করা হয়েছে।’
ডা. শাহীন শরিফ আরও বলেন, ‘হাসপাতালের পাঁচ নাম্বার ওয়ার্ড ছিল সার্জারি ওয়ার্ড। মেরামত কাজ চলায় সেটি পুরোপুরি বন্ধ ছিল। এখন সেখানে আপাতত কাজ বন্ধ করে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য ৪০টি বেড নতুন করে দেওয়া হয়েছে। এখন মোট এ হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য রয়েছে ৭৫টি বেড।
এদিকে, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেও অন্যান্য দিনের তুলনায় আজ ঈদের দিনে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি ছিল বলে জানান কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. রিমা আক্তার।
তিনি বলেন, ‘দুপুর পর্যন্ত রোগী ভর্তি হয়েছেন ৫০ জনের মতো। এর মধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও ছিল ‘নোটিশ’ করার মতো। ’
একই হাসপাতালের অপর চিকিৎসক ডা. শাহরিয়ার সিদ্দিকী বলেন, প্রায় ২০ থেকে ২৫ জনের মতো ভর্তি হয়েছেন যার মধ্যে নারী-পুরুষ ওয়ার্ড মিলিয়ে বেশিরভাগই ডেঙ্গু রোগী।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ষষ্ঠ তলার ‘সিভিয়ার ডেঙ্গু রোগী কর্নার’ নামের ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিটি বিছানাতেই রোগী আছেন। এখানেই কথা হয় ডেঙ্গু আক্রান্ত আসমা বেগমের সঙ্গে। তিনি রামপুরায় পরিবারের সঙ্গে থাকেন । ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার পর প্রথসে ছিলেন মগবাজারের কমিউনিটি হাসপাতালে । সেখানে প্রায় পাঁচ দিন থাকার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিক্যালে যাওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা। তারপর দিন গত ৩ আগস্ট এই হাসপাতালে আসেন তিনি।
আজ সোমবার চিকিৎসকরা তাকে বাড়ি যাওয়ার জন্য বলেছেন, তাতেই আনন্দ আসমা বেগমের। তিনি বলেন, একটা জ্বরে কেমন হাহাকার ফালাইয়া দিছে, আগে শুনছি কালাজ্বর আর এখন শুনি ডেঙ্গু জ্বর।
আসমা বেগমের পাশের বিছানাতেই আছেন বংশালের সাহিদা বেগম। এক ছেলে ও এক মেয়ে আর স্বামীকে নিয়ে তার সংসার। কথা বলতে বলতে কেঁদে দেন সাহিদা। কাঁদছেন কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মাইয়াডারে থুইয়া আইছি তালা মাইরা। কেউ নাই বাসায়। ছেলে আর ছেলের বাপ আমার সাথে এইখানে। মাইয়াডারে কে দেখবো, তাই তালা মাইরা রাইখা আসছে ওরা। সন্ধ্যায় বাসায় গিয়া তালা খুলবো, এক টুকরা মাংসও ঈদের দিনে পোলা-মাইডারে খাওয়াইতে পারলাম না, ঈদের দিনে হাসপাতালে পইরা রইছি।’ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ঈদের দিনে রোগী দেখছেন এক চিকিৎসক
হাসপাতাল থেকে লিফটে করে নামতে নামতে কথা হয় হাসিনা খাতুনের সঙ্গে। ১৪ বছরের নাতি শাহানশাকে নিয়ে তার সংসার। হাসিনা খাতুন বলেন, বাপ-মা মরা পোলাডা আমার লগে থাকে, কাজ করে ইস্টার্ন মল্লিকায় একটা টেইলারিং কারখানায়। গত ৯ দিন ধরে এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে শাহানশা। তবে ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে জানিয়ে হাসিনা খাতুন বলেন, নাতিডারে নিয়া বাড়ি যাইতে পারলেই শান্তি, আর আমু না হাসপাতালে।

/এআর/

x