লালবাগের প্লাস্টিক কারখানায় অগ্নিকাণ্ড দাহ্য পদার্থের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়েছে

আমানুর রহমান রনি ০৪:৩৬ , আগস্ট ১৫ , ২০১৯

 

এই ট্রান্সফর্মারে আগুন লেগেছিল অগ্নিকাণ্ডের আগে

লালবাগ ইসলামবাগের পোস্তা ঢাল এলাকার যে প্লাস্টিক কারখানাগুলো আগুনে পুড়েছে, সেগুলো ওই এলাকার শেষ মাথায়। পোস্তা ওয়াসা পাম্পের বিপরীত পাশের সরু পথ দিয়ে ভেতরে যেতে হয়। ইটের গাঁথুনির দোতালা ভবন, ওপরে টিন। পাশাপাশি অন্তত অর্ধশত প্লাস্টিক, পলিথিন ও কাঁচা চামড়া সংরক্ষণের কারখানা। অগ্নিকাণ্ডের সময় ওই কারখানার আশেপাশে মানুষ ছিলেন। কিন্তু প্লাস্টিক কারখানার দাহ্য পদার্থের আগুনের তীব্রতার কারণে কেউ আগুন নেভানোর সাহস করেনি। তারা দ্রুত নিরাপদে চলে গেছেন। এসব কারখানার কোনোটিতেই অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থাও নেই।

পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, টিপু হাজীর বাড়ি নামে পরিচিত এই বাড়িটির নিচতলায় প্লাস্টিক কারখানা এবং ওপরে গুদাম। ভবনটির গা-ঘেঁষে তিনটি বড়বড় ট্রান্সফরমার। এসব ট্রান্সফরমার দিয়েই এই কারখানায় বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণণা অনুযায়ী, বুধবার (১৪ আগস্ট) রাত ৯টার দিকে ভবনটির পেছনের একটি ট্রান্সফরমারে আগুনের ফুলকি দেখা যায়। এরপর পাশের কারখানার একজন কেয়ারটেকার বিষয়টি তার মালিককে জানান। তার মালিক বিদ্যুতের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জানান। তারা এসে সংযোগটি ঠিক করে দিয়ে যাওয়ার দুইঘণ্টা পরই আগুন লাগে বলে জানিয়েছেন ওই প্রত্যদক্ষদর্শী।

রাত পৌনে ১১ টার দিকে ইসলামবাগের পোস্তার ঢালের টিপু হাজীর বাড়িতে আগুন লাগে। বাড়িটিতে মামুন নামে এক ব্যক্তি প্লাস্টিক তৈরির কারখানা দিয়েছেন। গত দশ বছর ধরে তিনিই বাড়িটি ভাড়া নিয়ে আছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

আড়াইঘণ্টার প্রচেষ্টায় ফায়ার সার্ভিসের ১৫টি ইউনিট আগুন নেভাতে সক্ষম হয়। ঈদের ছুটি থাকায় কোনও হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। তবে একজন কারিগরকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কারখানাটির পাশ্ববর্তী অপর কারখানার কেয়ারটেকার চিত্তরঞ্জন।

তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি প্রথম রাত ৯টার সময় ট্রান্সফরমারে আগুন জ্বলতে দেখি। এরপর আমি আমার মালিককে ফোনে জানাই। কিছুক্ষণ পর বিদ্যুতের লোক এসে ট্রান্সফরমার ঠিক করে দিয়ে যায়। এর দেড় দুই ঘণ্টা পরই বিকট শব্দ করে মামুনের প্লাস্টিকের কারখানার ভেতরে আগুন জ্বলে। আমি সঙ্গে সঙ্গে সবাইকে জানাই। এসময় টহল পুলিশ এসে আমাদের সরিয়ে দেয়। এরপর ফায়ার সার্ভিস এসে পানি দেওয়া শুরু করে।’

তিনি বলেন, ‘টিপু হাজীর বাড়িটিতে দশ বছর ধরে প্লাস্টিক কারখানা চলে। নিচতলায় প্লাস্টিকের মগ, বালতি, খেলনা বানায়। দোতালায় একজন হাজী গুদাম করেছেন।’

আগুনের সময় কেউ ভেতরে ছিল না বলেও তিনি জানিয়েছেন। বাড়িটিতে একজন কেয়ারটেকার আছেন, তবে তাকে ঘটনার সময় তিনি দেখেননি।

চিত্তরঞ্জন বলেন, ‘আমি আট বছর ধরে এখানে চাকরি করি। আগুনের তাপ বেশি থাকায় আমরা পানি দেওয়ার সাহস করিনি। প্লাস্টিক থাকায় পুড়েছে অনেক। আবার শব্দও হয়েছে, তাই ভয়ে কেউ কাছে যায়নি। ফায়ার সার্ভিস আসার পর আমরা সবাই আগুন নেভাতে চেষ্টা করেছি।’

ফায়ার সার্ভিসের প্রচেষ্টায় নিয়ন্ত্রণে আসে অগ্নিকাণ্ড

আশরাফ নামে একজন প্রত্যক্ষদর্শী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্লাস্টিক কারখানার একজন কারিগরকে অগ্নিকাণ্ডের পরপরই অচেতন অবস্থায় বের করে নিয়ে যাওয়া হয়। ভেতরে আর কাউকে দেখিনি।’

ঘটনার পর পুরো এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়, এতে ওই এলাকা অন্ধকার হয়ে যায়। স্থানীয়রা ফায়ার সার্ভিসকে সহযোগিতা করে। পাশের মসজিদ ও ওয়াসা পাম্প থেকে পানির সংযোগ দেওয়া হয়। এতে পানি সরবরাহ করতে সুবিধা হয়েছে বলেও জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।

ঘটনাস্থল থেকে ফায়ার সার্ভিসের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক মো. হাবীবুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা খবর পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে এখানে আসি। আসার পর আমাদের রিজার্ভ পানির পাশাপাশি কাছাকাছি পানির উৎস খুঁজতে থাকি। এই এলাকা নিয়ে আমাদের ভালো করে স্টাডি থাকায় পানির উৎস কোথায় তা জানা আছে। তাই দ্রুত পানি পেয়ে যাই। তবে জায়গাটি গিঞ্জি হওয়াতে ঘটনাস্থল পর্যন্ত গাড়ি নেওয়া যায়নি। পাইপ সংযোগ দিয়ে পানি দিতে হয়েছে। এতে আমাদের বেগ পেতে হয়েছে, তবে আমরা কাজটি সঠিকভাবে করতে পেরেছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘ভেতরে প্রচুর দাহ্য পদার্থ রয়েছে, এজন্য আগুন দ্রুত ছড়িয়েছে। তবে আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি। প্রাথমিকভাবে আমরা কোনও হতাহতের খবর পাইনি। আমরা কাউকে উদ্ধারও করিনি। তবে কারখানা পুড়ে গেছে।’

এই ঘটনায় ফায়ার সার্ভিস তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে। বৃহস্পতিবার সরকারি ছুটি থাকলেও এই কমিটি কাজ করবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সোহরাব হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রাত সাড়ে ১২টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। আমরা কোনও হতাহতের খবর পাইনি।’

ওসি বলেন, ‘একাধিক প্লাস্টিক কারখানা ও গুদাম পুড়েছে। আমরা তথ্য সংগ্রহ করছি।’

ঘটনার পর কারখানার মালিকরা ঘটনাস্থলে আসেনি। তাদের আত্মীয়-স্বজনদের দেখা গেছে। তবে তারা কোনও কথা বলতে রাজি হননি।

উল্লেখ্য, গত ফেব্রুয়ারিতে লালবাগের চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ এক অগ্নিকাণ্ডে ৭৮ জনের প্রাণহানি হয়। ওই অগ্নিকাণ্ডে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির জন্যও প্লাস্টিকের গুদামকে দায়ী করা হয়। এরপর পুরান ঢাকায় প্লাস্টিক কারখানার বিরুদ্ধে একযোগে অভিযান চালানো হয়েছিল। তখন এই কারাখানাটিরও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। তবে প্লাস্টিক ব্যবসায়ীদের আন্দোলনের মুখে আবারও সব প্লাস্টিক ও পলিথিন কারখানায় বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাইদ খোকন সেসময় ব্যবসায়ীদের শর্ত দিয়েছিলেন- কারখানায় বালতি ভর্তি বালু, অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জম ও পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ থাকতে হবে।

 আরও খবর: লালবাগের প্লাস্টিক কারখানার আগুন নিয়ন্ত্রণে 

 

/এএইচ/

x