বাসাবাড়িতে এডিস মশা: ডিএসসিসির ‘ব্যবস্থা’ অ্যারোসল, ডিএনসিসির কী?

শাহেদ শফিক ০৭:৫৫ , আগস্ট ১৫ , ২০১৯

এডিস মশার উৎপত্তি স্থলের মধ্যে নগরবাসীর বাসাবাড়ি অন্যতম। এই জাতীয় মশা, তিন দিনের বেশি জমে থাকা স্বচ্ছ পানি, বাসার ছাদ, ফুলের টব, পরিত্যক্ত টায়ার, বেসিন, কমোড ও এসি বা রেফ্রিজারেটর পানিতে জন্মায়। এসবের সিংহভাগই বাসা বাড়ির অভ্যন্তরে হয়ে থাকে। কিন্তু মশা বা তার উৎপত্তিস্থল নিধনের দায়িত্বে থাকা দুই সিটি করপোরেশন তার নাগরিকদের বাসা বাড়িতে গিয়ে এসব ধ্বংস বা ওষুধ প্রয়োগের সুযোগ পায় না।

আর এ কারণে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) তার সামাজিক, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ নাগরিকদেরকে মশা মারার জন্য বিনামূল্যে অ্যারোসল ক্যান দেওয়া শুরু করেছে। পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ আদালতও পরিচালনা করে আসছে। তবে এক্ষেত্রে বেশ খানিকটা পিছিয়ে রয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। উত্তর সিটির ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা ছাড়া মশার এসব উৎপত্তি স্থল ধ্বংসে কোনও ব্যবস্থা দেখা যায়নি। তবে আগামী ১৯ বা ২০ আগস্ট থেকে প্রতিটি ওয়ার্ডকে কয়েকভাগে ভাগ করে একটি চিরুণি অভিযানের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সংস্থাটি। ওই অভিযানে কারও বাসাবাড়িতে ‘এডিসের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে’ শীর্ষক একটি স্টিকার লাগিয়ে দেওয়া হবে।

সম্প্রতি রাজধানী ঢাকাসহ দেশজুড়ে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। এ রোগে আক্রান্ত হয়ে শতাধিক মানুষের মৃত্যুও হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছে কয়েক হাজার মানুষ। পরিস্থিতি মোকাবিলায় দায়িত্বরত সংস্থাগুলো নানা উদ্যোগ-কর্মসূচিও গ্রহণ করে আসছে। সংগ্রহ করা হয়েছে নতুন ওষুধ। কিন্তু এরপরেও কিছুতেই ডেঙ্গু রোগ নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। সংস্থাটি মনে করছে শুধু ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যাবে না। এজন্য বাজারে বিদ্যমান মশা নিধনের কীটনাশকও বাসাবাড়িতে ব্যবহারের জন্য নাগরিকদের উৎসাহিত করতে হবে।

ডিএসসিসি সূত্র জানিয়েছে,সংস্থাটি তাদের নিয়মিত কর্মকাণ্ড পরিচালনার পাশাপাশি তাদের করদাতাদের মাঝে বিনামূল্যে অ্যারোসল বিতরণ করে আসছে। এরই মধ্যে সংস্থাটির আওতাধীন এক লাখ ৬৩ হাজার হোল্ডিং মালিক, ৭৬৩টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ৭৭৫টি মসজিদের জন্য দুই লাখ মশার অ্যারোসল কন্যা কেনা হয়েছে। এসিআই কোম্পানির উৎপাদিত ৩২০ টাকা দামের অ্যারোসল ক্যানগুলোর সরকারি ক্রয়নীতি অনুযায়ী ভ্যাট-ট্যাক্সসহ প্রতিটি ক্যান কেনা হয়েছে ২৮৮ টাকায়। প্রাথমিকভাবে ৫ কোটি ৭৬ হাজার টাকায় দুই লাখ ক্যান কেনা হলেও প্রয়োজনে আরও কেনা হবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। এর মাধ্যমে বাসা বাড়িতে থেকে ডেঙ্গু মশা নিধন কিছুটা সম্ভব হবে বলেও মনে করছে ডিএসসিসি।

ডিএসসিসি সূত্র আরও জানিয়েছে, হোল্ডিং মালিকদের অ্যারোসল বিতরণের পাশাপাশি ১ জুলাই থেকে এ পর্যন্ত ২৫ হাজার ৯৯৭টি বাড়ি পরিদর্শন করে ৮২৩টির লার্ভা ধ্বংস করেছে ডিএসসিসি। এছাড়া স্কাউটের মাধ্যমে ১ লাখ ১০ হাজার ৭৬৫টি ভবন পরিদর্শন শেষে ৬২ হাজার ২৩৭টি বাড়িতে লার্ভা ধ্বংসসহ নির্মাণাধীন কয়েক শতাধিক ভবন মালিককে জরিমানা করা হয়েছে।

এ বিষয়ে ডিএসসিসি মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যমাত্রা ধারণ করে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। যে করেই হোক প্রথমে একে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। এজন্য প্রতিদিনই বিভিন্ন বাসাবাড়ি ও নির্মাণাধীন ভবনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হচ্ছে। মশা নিধনের অ্যাডাল্টিসাইডিং ও লার্ভিসাইডিং কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। বর্তমানে ব্যবহৃত ওষুধের পাশাপাশি নতুন ওষুধ সংগ্রহ করে প্রযোগ করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, আমরা একটা জিনিস লক্ষ্য করেছি- এডিস মশার উৎপত্তি স্থলের মধ্যে বাসাবাড়ি অন্যতম। কিন্তু আমরা সেখানে ওষুধ প্রয়োগ করতে পারি না। এ কারণে আমাদের নিজস্ব তহবিল থেকে অ্যারোসল কিনে সম্মানিত করদাতাদের মাঝে ফ্রি বিতরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোকেও এই ক্যান বিনামূল্যে সরবরাহ করা হচ্ছে। আমরা গণমাধ্যমেও বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়ে দিয়েছি আমাদের নাগরিকরা যাতে প্রতিটি জোন অফিস থেকে কর পরিশোধের রশিদ দিয়ে এই অ্যারোসল সংগ্রহ করেন। এর মাধ্যমে আমরা আশা করছি কিছুটা হলেও বাসাবাড়িতে ডেঙ্গুর উৎপত্তিস্থল ধ্বংস হবে।

এদিকে বাসাবাড়ির এডিসের লার্ভা ধ্বংসে দক্ষিণ সিটির পাশাপাশি উত্তর সিটিও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে আসছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, বাসাবাড়িতে অভিযান করে যেসব বাসায় এডিস মশার লার্ভা বা উৎপত্তিস্থল পাওয়া যাবে প্রথমে সেই বাড়ির দরজার ‘এই বাড়ি/স্থাপনায় এডিস মশার অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছে’ লেখা স্টিকার লাগিয়ে দেওয়া হবে। এর পরেও যদি তারা সচেতন না হয় পরে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে। এছাড়া সংস্থাটি তাদের প্রতিটি ওয়ার্ডকে ১০ ভাগে বিভক্ত করে নাগরিকদের অন্তর্ভুক্ত করে প্রতিটি বাসা বাড়িতে চিরুণি অভিযান পরিচালনা করতে চায়। তবে এটি এখনও পরিকল্পনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। বাসা বাড়ির এডিস মশার লার্ভা ধ্বংসে শুধু কয়েকটি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা ছাড়া এখনও দৃশ্যমান কোনও পদক্ষেপ দেখা যায়নি ডিএনসিসিতে।

জানতে চাইলে উত্তর সিটির মেয়র আতিকুল ইসলাম বুধবার রাতে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমরা আজ এ বিষয়টি নিয়েই প্রধানমন্ত্রীর দফতরে মিটিং করেছি। আমাদের এক একটি ওয়ার্ডকে ১০টি ভাগে ভাগ করবো। সেখানে সামাজিকভাবে সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করবো। এর প্রতিটি কমিটি প্রতিটি বাড়িতে গিয়ে চেক করবে।

ডিএনসিসি মেয়র আরও বলেন, আসলে বাসা বাড়ির এডিস মশা নিধন শুধু সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব নয়, সবার দায়িত্ব। তাই আমরা সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করতে চাই। আমি চাই লার্ভা ধ্বংসে একটি চিরুণি অভিযান পরিচালনা করতে। সেই প্রস্তুতিই নিচ্ছি। টেস্ট কেস হিসেব আগামী ১৯ বা ২০ আগস্ট অভিযান পরিচালনা করতে চাই। এতে সফল হলে এই পদ্ধতিটি অন্যান্য সিটি করপোরেশনও অনুসরণ করতে পারবে। এক প্রশ্নের জবাবে আতিকুল ইসলাম তিনি বলেন, অ্যারোসল একটি সাময়িক পদক্ষেপ। আমি সময়কে নয়, গোড়ায় হাত দিতে চাই।

 

/টিএন/

x