বৈধ রিক্রুটিং লাইসেন্স নিয়ে লিবিয়ায় পাচার করে মুক্তিপণ!

সাদ্দিফ অভি ১৪:০৯ , সেপ্টেম্বর ১০ , ২০১৯

অন্য দুই ভাইয়ের মতো বিদেশে গিয়ে সচ্ছল হওয়ার আশায় ছোট ভাই নয়নকে বিদেশ পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন মুন্সীগঞ্জের মেহেদী হাসান সুমন। এজন্য রাজধানীর পুরানা পল্টনে রোজ ভেল্ট ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের (আর এল ৮১৩) অফিসে থাকা তাদের গ্রামের দালাল হায়াত উল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ করেন তিনি। এর কয়েকদিন পর এক লাখ টাকার বিনিময়ে নয়নকে লিবিয়ার পাঠায় হায়াত উল্লাহ। ১০ দিন পর নয়ন লিবিয়া থেকে ফোন করে জানায়, তাকে আটকে রেখে নির্যাতন করা হচ্ছে। মুক্তিপণ না দিলে তাকে গুলি করে হত্যা করা হবে। ঘটনা জানার পর সুমন পল্টন থানায় দালালসহ রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জানান, তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। তবে ভাইকে উদ্ধারের জন্য তিনি প্রশাসনের সহায়তা চেয়েছেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, রোজ ভেল্ট ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) নিবন্ধিত রিক্রুটিং লাইসেন্স আছে। যার নম্বর ৮১৩। বিএমইটি’র ডাটাবেজে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করা আছে লিবিয়ায় মুক্তিপণ চাওয়া আকবর হোসেনের নাম।

মামলার এজাহার ও সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দালাল হায়াতের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সুমনকে জানান, লিবিয়ায় ভালো কোম্পানির ভিসা আছে। এরপর গত ২০ জুন ভাইকে নিয়ে পল্টনের রোজ ভেল্ট ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনালের অফিসে আসেন তিনি। সেখানে লিবিয়ায় পাঠানোর জন্য এক লাখ টাকায় চুক্তি হয় ম্যানেজার সাঈদের সঙ্গে। টাকা দেওয়ার পর হায়াত জানান, ৪-৫ দিনের মধ্যে ফ্লাইট হয়ে যাবে। ২৯ জুন রাতে একটি ফ্লাইটে লিবিয়া পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। ভাইকে এয়ারপোর্টে দিয়ে আসেন সুমন নিজেই।

সুমন বলেন, ‘‘আনুমানিক ১০ দিন পর লিবিয়ার একটি নম্বর (+২১৮৯১৬৮৯৭৬১৩) থেকে আমার ভাই ফোনে জানায়, তাকে একটি রুমে আটকে রেখে আকবরের লোকেরা কষ্ট দিচ্ছে। বিষয়টি হায়াতকে জানালে সে বলে ‘আমি কথা বলে ঠিক করে দিচ্ছি’। এরপর ১০-১২ দিন নয়নের কোনও খোঁজ পাইনি। ২৭ জুলাই বিকালে লিবিয়ার অন্য একটি নম্বর (+২১৮৯১৯০৬৩০৩৮) থেকে নয়ন ফোন করে বলে, ‘ভাই আমাকে বাঁচান। আকবরের লোকেরা আমাকে একটি রুমে আটকে রেখে নির্যাতন করছে। এখান থেকে বাঁচতে হলে আকবরের বউ অথবা ভাইয়ের কাছে বাংলাদেশে ৬ লাখ টাকা দেন, না হয় আমাকে গুলি করে হত্যা করবে।’ সুমনকে নির্যাতনের একটি ভিডিও ইমোতে পাঠিয়েছে তারা।’

ভিডিওতে দেখা গেছে, নির্যাতনের পর মুক্তিপণ দিয়ে মুক্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রায়হান ভুইয়া জনিকে যে জায়গায় নির্যাতন করে ভিডিও করা হয় সেই জায়গা আর নয়নকে নির্যাতনের জায়গা একই। এ নিয়ে বাংলা ট্রিবিউন ‘স্পেনের কথা বলে লিবিয়ায় পাচার, নির্যাতনের পর মুক্তিপণ আদায়’ নামে একটি সংবাদ প্রকাশ করে।

সুমন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ভাইয়ের জীবন বাঁচাতে আমি আকবরের স্ত্রী গুলশান আরা বেগম ও সাঈদ মিয়ার কাছে ৩ লাখ টাকা দেই। টাকা নেওয়ার পর নয়নকে মুক্তি না দিয়ে আরও ৬ লাখ টাকা দাবি করে তারা। এরপর এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে হায়াতের বাড়িতে গেলে সে দেখা না করে নানা টালবাহানা শুরু করে। এদিকে প্রতিদিনই লিবিয়া থেকে ইমোতে ভয়েস মেসেজ পাঠায়ে টাকা দাবি করে। আমি নয়নের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি তার সঙ্গে আরও ১১ বন্দি আছে সেখানে। এলাকার দালাল হায়াত ও বিপুকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে উল্টো তারা আমাকে খুনের হুমকি দেয়। আমি সবার সঙ্গে আলাপ করে এই মাসের ৪ তারিখে পল্টন থানায় মামলা করি। আমি আমার ভাইকে মুক্ত করতে প্রশাসনের সহায়তা চাই।’

পল্টন থানায় মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনের ৭, ৮, ১০ ধারায় করা মামলায় আসামি করা হয়েছে ৬ জনকে। এরমধ্যে আছে দালাল হায়াত উল্লাহ, দালাল বিপু, রোজ ভেল্ট ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী আকবর, আরেক স্বত্বাধিকারী আকবরের ভাই আক্তার হোসেন, আকবরের স্ত্রী গুলশান আরা বেগম ও প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজার সাঈদ মিয়া।

মামলার হওয়ার পর থেকে প্রতিষ্ঠানটির দরজায় তালা দেওয়া বলে সুমন জানালেও সোমবার (৯ সেপ্টেম্বর) প্রতিষ্ঠানটি খোলা পাওয়া যায়। সেখানে খোঁজ করে অভিযুক্ত কাউকে পাওয়া যায়নি। তবে অনুসন্ধানে জানা যায়, একটি লাইসেন্স নিয়ে এই অফিসে কয়েকটি নামধারী প্রতিষ্ঠান কাজ করে। তবে প্রতিষ্ঠানের নাম একটি। একই অফিসের ভেতরে তিনটি স্তরে রুমের মতো বানানো। এরকম রুম আছে তিনটি।

আশপাশের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ম্যানেজার সাঈদ অফিসে খুব কম আসে। তাকে ফোনেও পাওয়া যায় না। আর আকবর বর্তমানে লিবিয়ায় অবস্থান করছে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্টন থানার এস আই আরশাদও বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ওই অফিসে কয়েকজন সাবলেট হিসেবে ভাড়া নিয়ে বিদেশে লোক পাঠানোর কাজ করে। অফিসের ম্যানেজার সাঈদ মামলা হওয়ার পর থেকে আত্মগোপনে। আসামিদের গ্রেফতারে আমরা তথ্য প্রযুক্তির সহায়তা নিচ্ছি। আশা করি দ্রুত গ্রেফতার করতে পারবো।’

বিএমইটি জানিয়েছে, মামলা হলে তা আদালতের বিষয়। আদালত রায় দিলে আমরা তারপর লাইসেন্স বাতিল করবো।

বিএমইটির পরিচালক (কর্মসংস্থান) ডি এম আতিকুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মানবপাচার একটি গুরুতর অপরাধ। আমাদের কাছে সরাসরি অভিযোগ এলে আমরা তদন্তের নির্দেশ দেই। তদন্তে প্রমাণ হলে আমরা লাইসেন্স বাতিল করি। মামলা হলে এটা আদালতের বিষয়।’

/এসও/এসটি/এমওএফ/

x