ধর্ষকের সঙ্গে বিয়ে হয় কীভাবে?

উদিসা ইসলাম ১৯:২৩ , সেপ্টেম্বর ১০ , ২০১৯

বিয়ে

পাবনায় সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ তোলা গৃহবধূর সঙ্গে অভিযুক্ত ধর্ষকের বিয়ে দেওয়ার ঘটনাটিকে আইন বহির্ভূত ও স্বেচ্ছাচার বলে উল্লেখ করেছেন মানবাধিকারকর্মী ও নারী নেত্রীরা। তারা বলছেন, বিভিন্ন সময় ধর্ষকের সঙ্গে ভুক্তভোগী নারীকে বিয়ে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। নিপীড়কের সঙ্গে নিপীড়িত নারীকে বিয়ে দেওয়ার মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার হওয়া উচিত।

পাবনা সদর উপজেলার দাপুনিয়া ইউনিয়নের সাহপুর যশোদল গ্রামের ওই গৃহবধূর মা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, গত ২৯ আগস্ট মেয়েকে তুলে নিয়ে যাওয়ার খবর পান তারা। প্রধান অভিযুক্ত রাসেল দীর্ঘদিন ধরে তার মেয়েকে বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক স্থাপনের প্রস্তাব দিয়ে আসছিল। পরবর্তীতে তাকে ডেকে নিয়ে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অফিসে আটকে রাখে। এরপর ৫ সেপ্টেম্বর পরিবার খবর পায় যে, তাদের মেয়ে হাসপাতালে রয়েছেন।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ভিকটিমের সঙ্গে কথা বলেন তার চাচা। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হাসপাতালে মেয়ে  বলেছে, কীভাবে তার ওপরে নিপীড়ন চালিয়ে নানাবিধ ভয় দেখানো হয় এবং পরবর্তীতে তাকে মুখ বন্ধ রাখতেও বলা হয়।’  এরপর পরিবারের পক্ষ থেকে মেয়েকে নিয়ে থানায় গেলে মামলা করার বিষয়ে সহযোগিতা পাননি বলেও অভিযোগ করেন ওই গৃহবধূর চাচা।

তিনি বলেন, ‘অভিযোগ করার সময় অভিযুক্তরা থানার বাইরে ভিড় করায় কীভাবে মেয়েকে নিরাপদ রাখবো জানতে চাইলে ওসি বলেন— মেয়েকে থানাতেই রেখে যেতে। পরিস্থিতি শান্ত হলে তারা মেয়েকে বাড়িতে পৌঁছে দেবেন। পরদিন সকালে তারা জানতে পারেন যে, মেয়েকে নাকি বিয়ে দেওয়া হয়ে গেছে। এরপর আমরা আর মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করিনি।’

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক শিপা হাফিজা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ধর্ষকের সঙ্গে ধর্ষণের শিকার নারীর বিয়ে দেওয়া জঘন্য অপরাধ। ধর্ষক আক্রমণকারী, যে কিনা নারীকে তার অমতে অপমানিত করেছে। নারীর শরীর অপমানিত হয়েছে তা বলছি না। অসম্মতিতে সে অপরাধ সংঘটনের মধ্যদিয়ে তাকে অপমান করেছে। ধর্ষক সবসময়ই ফৌজদারি আসামি। তার সঙ্গে বিয়ে হয় কী করে, তাও আবার থানায়? যাদের ওপর আইনশৃঙ্গলা রক্ষা ও প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব দেওয়া আছে, তাদের দ্বারা আইনের এমন লঙ্ঘনের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত।’

এধরনের বিয়ে কোনোভাবেই হতে পারে না উল্লেখ করে শিপা হাফিজা  আরও  বলেন, ‘‘এধরনের ঘটনা যদি হতে থাকে, তাহলে ধর্ষণ উৎসাহিত হয়। এ ঘটনাগুলোর জন্যই ধর্ষণ বাড়ছে। কেননা, অপরাধীরা মনে করছে— যদি কোনও নারীকে সে স্পর্শ করে, তাহলে সেই নারীর ‘সম্ভ্রম’ রক্ষায় তাকে বিয়ে করার সুযোগ এই সমাজ করে দেবে।’’

মানবাধিকারকর্মী নূর খান মনে করেন, এধরনের ঘটনা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বড় বাধা। তিনি বলেন, ‘অনেক সময় আদালতের মাধ্যমেও নানা সমাধানের কথা আমাদের কানে আসে। এধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে কোনও সমঝোতার সুযোগ তৈরি করে দেওয়াও অপরাধ।’ থানায় বিয়ের এই ঘটনার প্রকৃত তদন্ত করে জড়িতদের শাস্তির ব্যবস্থা করা উচিত বলেও তিনি মত দেন।

সংঘবদ্ধ এই ধর্ষণের অভিযোগ দায়েরের পর অভিযুক্ত ধর্ষকের সঙ্গে ভিকটিমের বিয়ে দেওয়ার ঘটনায় সোমবার (৯ সেপ্টেম্বর) তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি অভিযোগকারীর সঙ্গে অভিযুক্তকে থানার ভেতরে বিয়ে দেওয়ার ঘটনায় পাবনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওবাইদুল হককে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আজ  (মঙ্গলবার, ১০ সেপ্টেম্বর) রাত ১২টার মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হবে উল্লেখ করে পাবনার পুলিশ সুপার রফিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রতিবেদনটি হাতে পেয়ে তারপর আমি প্রতিক্রিয়া জানাতে চাই।’ তবে ঘটনাটি কেবল থানায় বলেই না, কোনোভাবেই ধর্ষকের সঙ্গে নিপীড়নের শিকার নারীর বিয়ে দেওয়া উচিত কাজ না বলে মনে করেন পুলিশ সুপার।

নারী নেত্রী অ্যাডভোকেট সালমা আলী মনে করেন— এধরনের ঘটনা আইনের আশ্রয় নিতে চাওয়া যেকোনও ব্যক্তির জন্য হুমকিস্বরূপ। তিনি বাংলা ট্র্রিবিউনকে বলেন, ‘ধর্ষণ এত বড় অপরাধ, সেখানে আসামির সঙ্গে ভিকটিমকে বিয়ে দিয়েছেন যে কর্মকর্তা, তার শাস্তি হওয়া উচিত এবং কী শাস্তি হচ্ছে, সেটাও জনগণকে জানাতে হবে।’

ধর্ষণের একটি মামলার উদাহরণ টেনে সালমা আলী বলেন, ‘মাদ্রাসা শিক্ষকের দ্বারা ধর্ষণের শিকার এক শিক্ষার্থীর হয়ে মামলা করে আমরা উচ্চ আদালত থেকে তার (শিক্ষার্থীর) কাস্টডি নিয়েছিলাম। ওই মামলায় আসামির যাবজ্জীবন হয়। আর  মেয়েটি পরবর্তীতে তার জীবন নিয়ে এগিয়ে গেছে। আইনজীবী হিসেবে তাকে উদ্ধার করলাম আমরা। পুলিশ তার দায়িত্ব হিসেবে যেখানে আসামি ধরবে, এধরনের বিয়ে বন্ধ করবে, সেখানে ওসি নিজেই যদি সেই অপরাধে যুক্ত হন, তাহলে ভুক্তভোগীরা কার কাছে যাবে।’

 

/এপিএইচ/

x