‘ছাত্রলীগের খুনের দায় নেবে কে?’

ঢাবি প্রতিনিধি ২২:৪৮ , অক্টোবর ০৯ , ২০১৯

বুয়েট শিক্ষার্থী আবরারকে হত্যার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিপীড়নবিরোধী শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সমাবেশ

‘পরিস্থিতি এমন হয়েছে এখন সব সিদ্ধান্ত নিতে হয় প্রধানমন্ত্রীকে। ছাত্রলীগের নেতা নির্বাচন,বহিষ্কার থেকে শুরু করে সব সিদ্ধান্তই আসে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে। সরকারের অনেক মন্ত্রীও বিভিন্ন সময়ে দেওয়া বক্তব্যে এমন কথাই বলেছেন।ছাত্রলীগের সব যদি প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তে হয়,তাহলে তাদের খুনের দায় নেবে কে?’ বুধবার (৯অক্টোবর) দুপুরে ‘আবরার হত্যার প্রতিবাদে আয়োজিত প্রতিবাদ সমাবেশে এমন প্রশ্ন করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।

‘নিপীড়নবিরোধী শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের ব্যানারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যের সামনে ওই সমাবেশের আয়োজন করা হয়।

বুয়েট শিক্ষার্থী আবরারকে হত্যার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিপীড়নবিরোধী শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সমাবেশ

সমাবেশে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘অনেকে প্রশ্ন করেছেন একজন শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে মেরে ফেলার অধিকার ছাত্রলীগকে কে দিয়েছে? এর জবাব কিন্তু ছাত্রলীগের নেতাদের কাছে আছে।’

দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি চলছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘‘বাংলাদেশে আইন-আদালত নেই, এই প্রতিষ্ঠান এখন আর দেশে কাজ করে না। একজন মন্ত্রী খুব পরিষ্কারভাবে বলেছেন ‘প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা ছাড়া দেশে কিছু হয় না’। প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা ছাড়া যদি কিছু না হয়, তাহলে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা পরিষ্কারভাবে বলবেন, ‘আমাদের এই অধিকার দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।’ আমাদের প্রশ্ন, নেতাদের নিয়োগ দেয় কে? নেতাদের বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয় কে? সব যদি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে হয়, তাহলে ছাত্রলীগের যে ভূমিকা সেটির দায়-দায়িত্ব কার?’’

তবে, এটি আমাদের সৌভাগ্য আবরারের শেষ কথাটি আমরা জানতে পেরেছি। আবরার তার স্ট্যাটাসে যেসব তথ্য দিয়েছে সেখানে যুক্তি দিয়ে কথা বলেছে। তার স্ট্যাটাসের প্রথম বক্তব্য ছিল ‘‘বাংলাদেশের বন্দর, নৌবন্দর, সমুদ্রবন্দর মংলা এবং চট্টগ্রাম, সেগুলো এখন থেকে ভারত দেশি প্রতিষ্ঠানের মতো ব্যবহার করতে পারবে’ এই কথাগুলো বলে সে কাউকে কটূক্তি করেনি, প্রধানমন্ত্রীর নামও নেয়নি। শুধু তথ্য যুক্তি দিয়ে সে জানতে চেয়েছে ‘আমাদের যেখানে পানির সংকট সেখানে পানি চলে যাচ্ছে ভারতে’। আর বাংলাদেশের মন্ত্রীরা বলেছেন,মানবিক কারণে নাকি দেওয়া হয়েছে। মানবিক কারণে পানি আমাদের ভারতে কাছে প্রাপ্য, উল্টো ফেনী নদী থেকে ভারতকে দেওয়া হচ্ছে পানি।’’

বুয়েট শিক্ষার্থী আবরারকে হত্যার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিপীড়নবিরোধী শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সমাবেশ

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন,‘যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্ররা তাদের অধিকার আদায়ের জন্য রাজনীতি করার কথা ছিল সেখানে দলীয় লেজুড়বৃত্তি করায় ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন ছাত্ররা। আর তখনই এধরনের খুনের ঘটনা ঘটে। যারা এখন খুনি তাদের ছোট ভাইদের বুকে আগলে রাখার কথা ছিল,অথচ এখন তারা ছোটদের পিটিয়ে হত্যা করছে কিসের জন্যে,কার স্বার্থে? শুধুমাত্র ফেসবুকে একটি লেখার কারণে, নাকি ক্ষমতার দম্ভ দেখার কারণে? বাংলাদেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট একটি লেখার কারণে যাকে হত্যা করা হয়েছে তাতে ক্ষতি হয়েছে মত প্রকাশের স্বাধীনতার, ক্ষতি হয়েছে অ্যাকাডেমিক ফ্রিডমের। এই শিক্ষাঙ্গনগুলোতে বারে বারে অ্যাকাডেমিক ফ্রিডমের ওপর আঘাত হচ্ছে। যে শিক্ষাঙ্গনগুলোতে শিক্ষার্থীদের নির্ভয়ে চলার কথা ছিল,সেগুলো এখন ভয়ের জনপদে পরিণত হয়েছে। আমরা কোন বিশ্ববিদ্যালয়টির কথা বলবো? জাহাঙ্গীরনগরের দিকে যাবো? যেখানে ভিসি নিজেই টাকার ভাগাভাগি করেন! যেখানে তিনি ছাত্রলীগ নেতাদের ডেকে নিয়েই বলেন ‘বাবা তোমাদের ভাগের টাকাগুলো নাও’ আর বাকি ভাগটি আমরা চেটেপুটে খাই! এই চেটেপুটে খাওয়া যদি ঠেকাতে হয়,যদি ছাত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়,তাহলে দলীয় লেজুড়বৃত্তি রাজনীতি নয়, সুস্থ ছাত্র রাজনীতিই ফিরে আনতে হবে।

বুয়েট শিক্ষার্থী আবরারকে হত্যার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিপীড়নবিরোধী শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সমাবেশ

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এত ঘটনা ঘটে কিন্তু কেন উপাচার্য এবং প্রভোস্টের বিরুদ্ধে আইন আদালতও কিছু করতে পারে না তা জানতে চান এই আইনজীবী। তিনি আরও বলেন, ‘কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় আমি নিজেই মামলা করেছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, প্রক্টর, প্রভোস্টের বিরুদ্ধে, কিন্তু কিছু করতে পারিনি। সবগুলো প্রতিষ্ঠানে যদি নতজানু নীতি চলমান থাকে, তাহলে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবো আমরা? শিক্ষার্থীদের জন্য আজকে আমাদের রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করতে হচ্ছে। এসব শিক্ষার্থীকে মানুষ করতে তাদের অভিভাবক যেমন হিমশিম খাচ্ছেন, আবার তাদের লাশ নিয়েও আজ  তারা হিমশিমে পড়ছেন।

ক্ষুব্ধ কন্ঠে হল প্রশাসনের সমালোচনা করে তিনি বলেন,  শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দেওয়া হলের প্রভোস্টদের দায়িত্ব তা কেন তারা মনে করবেন না? যদি দায়িত্ব নিতে না পারেন তাহলে কেন পায়ে ধরে এইসব পদে বসে রয়েছেন? কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ভিসিরও প্রাইমারি স্কুল চালানোর মতো যোগ্যতা নেই, কিন্তু তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গা পরিচালনার জন্যে বসে আছেন। এসময় সাধারণ মানুষের অর্থে এসব বিশ্ববিদ্যালয় চলে সে কথা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্যদের স্মরণ করিয়ে দেন তিনি।

বুয়েট শিক্ষার্থী আবরারকে হত্যার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিপীড়নবিরোধী শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সমাবেশ

তিনি বলেন, যে রাজনীতি আজকে শিক্ষার্থীদের জীবন বিপন্ন করে তুলেছে, আমি তার প্রতিবাদ জানাই। ভারতের সঙ্গে যে চুক্তি নিয়ে কথা হচ্ছে সে চুক্তির বিরুদ্ধে আমরা সবাই। আজকে আমরা ক্ষমতাহীন হয়ে পড়েছি। আমাদের কণ্ঠ দুর্বল হয়ে পড়েছে আপনাদের সন্ত্রাস এবং নিপীড়নের কারণে। ভাবছেন আমরা এসবের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারবো না। যদি ভেবে থাকেন যে দেশকে বিক্রি করে দেওয়ার চুক্তিগুলো আপনারা বাস্তবায়ন করতে পারবেন, তাহলে ভুল করছেন। এই হুঁশিয়ারি বার্তা দিয়ে গেলাম।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন বলেন, ‘আমাদের সামনেই শিক্ষার্থীদের নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে। যা আমরা বিভিন্ন সময়ে দেখেছি। গত বছর এসএম হলে এহসান রফিকের চোখের আলো নিভিয়ে দেওয়া হয়েছিল। শিক্ষার্থীদের নির্যাতনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে গণরুম, গেস্টরুম, রাজনৈতিক রুম থাকে। এসব ঘটনা প্রতিদিনের-ই। যা কোনও শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর সবাই জানতে পারে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এম এম আকাশ বলেন, ‘আগে দেশে কোনও খারাপ ঘটনা ঘটলে মানুষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়সহ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতো। কিন্তু বর্তমানে এই মর্যাদা এখন কোনও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নেই। সেই মর্যাদা হারানোর অন্যতম কারণ হলো রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি। এছাড়াও আমাদের নৈতিকতা নষ্ট হয়ে গেছে। বহু আগেই আমরা এর প্রতিবাদ করতে পারতাম। আমরা সবাই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গেস্টরুম-গণরুমের কথা জানি। বুয়েটে প্রায় প্রতিদিন রাতেই কাউকে না কাউকে টর্চার সেলে অত্যাচার করা হয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও একই অবস্থা। আমরা এও জানি যে, এই সমাবেশের পরপরই গণরুম-গেস্টরুম বন্ধ হবে না। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও প্রক্টররাও বিন্দুমাত্র বিচলিত হবেন না। তারা সরকারের কথা অনুযায়ীই চলবেন। বাংলাদেশে আজ গণতন্ত্র নেই। আজ ভারতের সঙ্গে আমরা অসম লেনদেন হচ্ছে। যতটুকু আমরা ভারত থেকে পাচ্ছি, তার চেয়ে বেশি আমরা দিচ্ছি। এছাড়াও সরকার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য ছোট ছোট সাম্রাজ্য তৈরি করছে। প্রত্যেক সাম্রাজ্যের একেকজন অধিপতি তৈরি করা হয়েছে। সেটা ছাত্রলীগ বা যুবলীগ বা যে নামেই হোক না কেন, সবখানে তারা আইন হাতে তুলে নিচ্ছে।

ডাকসুর ভিপি নুরুল হক বলেন, ‘সারা দেশে সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ সন্ত্রাসবাদী রাজনীতি করছে। যার কারণে কিছু দিন পর পর আমরা শিক্ষার্থীর মৃত্যুর খবর শুনতে পাই। যারা এ ধরনের সন্ত্রাসী কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত, তাদের শাস্তি না দিয়ে বরং পুরস্কৃত করা হচ্ছে।’

অভিভাবক  রাফিজা শাহীন বলেন, ‘আমি একজন মা। আমার সন্তানের যদি এই পরিণতি হয় তাহলে আমি বুঝতে পারতাম যে সন্তান হারানোর বেদনা কেমন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার যন্ত্রণা প্রধানমন্ত্রী ভোগ করছেন। একজন আপনজন হারানোর কষ্ট তিনিও বোঝেন। আমরা আবরারসহ সকল হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার দাবি করছি।’

সমাবেশে  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সামিনা লুৎফা সঞ্চালনা করেন। এতে বক্তব্য রাখেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন খান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌস প্রমুখ।  উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. তাসনীম সিরাজ মাহবুব, অধ্যাপক গীতি আরা নাসরীন, অধ্যাপক ড. কাবেরী গায়েনসহ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন শিক্ষক। এতে সংহতি জানিয়েছে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, হিল উইমেন্স ফেডারেশন, জাতীয় গণতান্ত্রিক গণমঞ্চ, প্রগতিশীল ছাত্রজোট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হল সংসদ, নারী মুক্তি কেন্দ্র ইত্যাদি।

 

/টিএন/

x