যেভাবে বেরিয়ে আসছে বুয়েটে বিভিন্ন সময়ের ‘নির্যাতনের’ তথ্য

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট ০১:১৯ , অক্টোবর ১১ , ২০১৯

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের পর একে একে মুখ খুলতে শুরু করেছেন শিক্ষার্থীরা। বুয়েটের কম্পিউটার কৌশল বিভাগের যে সার্ভারে তারা নির্যাতনের তথ্য পাঠাচ্ছিলেন, টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা (বিটিআরসি) বুধবার (৯ অক্টোবর) তা বন্ধ করার নির্দেশনা দেয়। এরপর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সফটওয়্যার ডেভেলপারদের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ‘গিটহাব’-এর ওয়েবসাইটে নতুন একটি লিংক তৈরি করে বুয়েট শিক্ষার্থীরা। সেখানেই উঠে আসছে নির্যাতনের নানা তথ্য। এই লিংকে পরিচয় গোপন রেখেও তথ্য পাঠানো যায়।

জানা গেছে, নতুনটাতে পুরনো সাইটের পেজে দেওয়া অভিযোগগুলোর ব্যাকআপ আছে। এছাড়া বৃহস্পতিবার (১০ অক্টোবর) সকাল থেকে অন্তত নতুন আরও ১০টি অভিযোগ এসেছে।

গিটহাবের ওই লিংকে এখন পর্যন্ত মোট রিপোর্ট ৮১টি। বুয়েট শিক্ষার্থীদের ওপর বিভিন্ন সময়ের নির্যাতনের বর্ণনা ছাড়াও সেখানে আসছে আবরার হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত ঘটনার বর্ণনাও।

ওয়েবসাইট থেকে প্রাপ্ত রিপোর্টগুলোতে দেখা যাচ্ছে, একজন শিক্ষার্থী র‍্যাগিংয়ের নামে তার সঙ্গে ঘটানো যৌন হয়রানির কথা উল্লেখ করেছেন। আরেকজন বলছেন ভয়াবহ শারীরিক নির্যাতনের কথা।

ঘটনার বর্ণনায় সেখানে একজন লিখেছেন– ‘২০১৬ সালের মে মাসে শবে মেরাজের রাতে সিএসইউ (চিটাগং স্টুডেন্ট ইউনিয়ন) ২০১৫ ব্যাচের নবীনবরণের পর সবাইকে খাবার বিলি করা হয়। খাবার বিলির সময় প্রথম বর্ষের ’১৫ ব্যাচকে দ্বিতীয় বর্ষের ’১৪ ব্যাচ বলে যে, সবাই যাতে খাবার খেয়ে আবার ক্যাফের সামনে জড়ো হয়। এরপর তারা ছাদে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর শুরু হয় হেয় করা কথাবার্তা। কিছুক্ষণ পর নামাজ শেষে কিছু ছেলে এলে তাদের সারি করে দাঁড়া করানো হয়।  এরপর কয়েকজনকে বলা হয় পরস্পরকে থাপ্পড় মারার জন্য। থাপ্পড় জোরে না হলে বারবার মারতে হবে। এদের মধ্যে একজন থাপ্পড় মারতে অস্বীকৃতি জানায়। তখন বলা হয়- কেন থাপ্পড় মারবি না? ব্যাচমেটকে থাপ্পড় দিবি না তো কী সিনিয়রকে মারবি?’   

‘এরপর অপর একজন শিক্ষার্থীকে তৃতীয় লিঙ্গের সম্প্রদায়ের মানুষের মতো অভিনয় করে দেখাতে বলা হয়। এছাড়াও নারী ব্যাচম্যাটের সঙ্গে রঙ উৎসবে নাচার জন্য বিকৃত শব্দসহ অভিনয় করানো হয়।’ ওই রাতের কারণে অনেক দিন ধরে তারা ট্রমাটাইজড ছিলেন বলেও সেখানে উল্লেখ করা হয়।

এই ঘটনার বর্ণনার নিচে অন্যান্য ভুক্তভোগীরাও এসে সত্যতা কথা জানাচ্ছেন বলেও জানা গেছে।

আবার আরেক ভুক্তভোগী লিখেছেন- ‘২৮ আগস্ট ২০১৫ থেকে শুরু করে ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৫। নিউজ ঘাটলে দেখবেন, সেসময় শিবির সন্দেহের ধুয়া তুলে বুয়েটের হলগুলোতে বহু ছাত্রকে হল ছাত্রলীগ টর্চার করেছিল। আমি নজরুল ইসলাম হলের ছাত্র ছিলাম। তখন নজরুল হল ছাত্রলীগের টর্চার সেল ছিল রুম নম্বর ১০৫ আর ৩০৫। হলের সব মদ-গাঁজার আসর বসতো এই রুম দুটোতে।  সবচেয়ে কষ্টের ব্যাপার ছিল সেসময় ১৪ ব্যাচ কেবল প্রথম টার্ম শেষ করেছে, আর ১৩ ব্যাচ দ্বিতীয় টার্ম। এই দুই ব্যাচের ওপর ঝড় গিয়েছিল সেসময়।’

‘সেসময় বুয়েট ছাত্রলীগ সভাপতির নেতৃত্বে সব হলে তল্লাশি চলেছিল, আর খুঁজে খুঁজে সব নামাজ পড়ুয়া-তাবলীগ করে-এমন ছেলেদের মার্ক করে ধরে ধরে শিবির সন্দেহে পিটিয়েছিল। কাউকে পুলিশে দিয়েছিল, কাউকে বুয়েট প্রশাসনের হাতে তুলে দিয়েছিল। অনেককে মেরে মুচলেকা নিয়ে সাদা কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে ছেড়ে দিয়েছিল। অনেকে এই ঘটনায় হল থেকে নিজেরাই ভয়ে চলে গিয়েছিল।’

সেখানে আরও উল্লেখ করা হয়, বুয়েট প্রশাসন সব ধামাচাপা দিতে অভিযুক্ত নিরপরাধ ছাত্রদের কয়েকজনকে এক টার্মের জন্য অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম থেকে বহিষ্কার করে, তাদের হল থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করে আর কয়েকজনকে সতর্ক করে। আর ঘটনার পেছনের কুশীলব ছাত্রলীগ নেতাদের কোনও জবাবদিহিতা দিতে হয়নি তখন।

আরেকজন বর্ণনা করেন ৪ অক্টোবরের ঘটনা। বলা হয়, ‘শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে ৫ মিনিটের মধ্যে শেরে বাংলা হলের ২০০৫ নং রুমে আসার জন্য ডাকা হয়। যখন আমি রুমে প্রবেশ করি সঙ্গে সঙ্গে আমার মোবাইল ফোন নিয়ে নেওয়া হয় এবং কোনও কথা ছাড়াই এলোপাথাড়ি থাপ্পড় মারা শুরু করে। কিছুক্ষণ মারধরের পর আমাকে জিজ্ঞাসা করে- একবছর আগে দুজন শিক্ষার্থীকে আমি গালি দিয়েছে কিনা। আমি স্বীকারোক্তি না দেওয়ায় আমাকে আরও মারধর করা হয়। এরপর কয়েকজন আমাকে ২০১১ নম্বর রুমে নিয়ে যায়। শাসানোর কিছুক্ষণ পর আমাকে রুমে পাঠিয়ে দেয়। আমি রুমে পাঁচ মিনিট অবস্থান করতে না করতেই ১৬ ব্যাচের কয়েকজন আমার বর্তমান রুম ৪০০৭ এ ঢুকে আবার আমার মোবাইল নিয়ে নেয় এবং আমি কোনও ভিডিও করেছি কিনা তা চেক করে। ভিডিও না পেয়ে তারা আমার মেসেঞ্জার চেক করে। আমার মেসেঞ্জার থেকে আমি সেজে ওপর এক ভাইকে ফাঁসানোর চেষ্টা করে। কিন্তু ব্যর্থ হওয়ার তারা আমার মেসেঞ্জার থেকে কিছু ব্যক্তিগত মেসেজের স্ক্রিনশট নিয়ে নেয়।’

তিনি আরও লেখেন, ‘এরপর ১৬ ব্যাচের একজনকে নির্দেশ দেয়, একটা স্ট্যাম্প নিয়ে আসার জন্য। এরপর ১৬ ব্যাচের এক শিক্ষার্থী আমাকে মাথায় তুলে কয়েকবার ফ্লোরে, চেয়ারে এবং বেডের ওপর আছাড় মারে, এরপর ফ্লোরে ফেলে দিয়ে লাথিঘুষি এবং স্ট্যাম্প দিয়ে মারধর করা শুরু করে। আমার পা ও কোমরে অতিরিক্ত ব্যাথা পাই যার কারণে আমি পরবর্তী চারদিন ঠিকমত হাঁটাচলাও করতে পারিনি। এরপর ১৭ ব্যাচ আমাকে ১০-১৫ মিনিটের মতো মারধর করে। তখনও আমি ফ্লোরে ব্যাথা পেয়ে কাতরাচ্ছিলাম। এসময় একজন আমাকে বারবার পেছন থেকে লাথি দিচ্ছিলো। আমার বুকের ওপর পা দিয়ে আরেকজন কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। প্রায় সাড়ে ৩টার দিকে তারা আমাকে পাহাড়ায় রেখে বাইরে বের হয়। ঘণ্টাখানেক পর কয়েকজন আবারও রুমে এসে আমাকে আরও শারীরিক নির্যাতন করা শুরু করে। আধমরা অবস্থায় আমাকে সকাল ৬টার দিকে রুমে রেখে চলে যায় তারা। আমার কথা হলো, একজন থার্ড ইয়ারের ছেলেকে তারা এভাবে নির্যাতন করতে পারে? নাজানি অন্যদের তারা কীভাবে নির্যাতন করে। নিহত আবরার কে না তারা কতো নির্মমভাবে হত্যা করেছে।’

উল্লেখ্য, বিটিআরসির সিস্টেম অ্যান্ড সার্ভিস বিভাগের জ্যেষ্ঠ সহকারী পরিচালক প্রকৌশলী মো. আসিফ ওয়াহীদ বুধবার (৯ অক্টোবর) দেশের সংশ্লিষ্ট গেটওয়েতে জরুরি মেইল পাঠিয়ে ওই পেজটি ব্লক করার জরুরি নির্দেশনা পাঠান। তারপর পেজটি ব্লক করে দেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৬ সালে বুয়েটের কম্পিউটার কৌশল বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থী ওয়ানস্টপ অনলাইন রিপোর্টিং সিস্টেম নামের একটি সার্ভার তৈরি করেন। সেটার পেজে শিক্ষার্থীরা তাদের অভিযোগ দিতে পারতেন। বুয়েট শিক্ষার্থী ফাহাদ হত্যার পরে ওই পেজে নতুন অনেক অভিযোগ জমা পড়ে।

বন্ধ পেজটির বিষয়ে জানতে চাইলে বুয়েটের কম্পিউটার কৌশল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবিএম আলিম আল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এটা বিভাগের (কম্পিউটার কৌশল) কাজের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। বিভাগের এক ‘ইন্টারনাল’ সিদ্ধান্তে গতকাল (বুধবার) এটা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

আরও খবর:

পুরনোটা বন্ধ, নতুন পেজে অভিযোগ জানাচ্ছেন বুয়েট শিক্ষার্থীরা

আবরার ফাহাদ হত্যায় সকালের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি

আবরার হত্যা: মাদক দিয়ে ‘গণপিটুনির নাটক’ সাজাতে চেয়েছিল ছাত্রলীগ 

 

আবরার হত্যার মোটিভ এখনও পরিষ্কার নয়: মনিরুল ইসলাম

 

 

 

 

/এসও/ ইউআই/ এএইচ/

x