খালেদা জিয়া কি ফিরবেন?

মানিক মিয়াজি, আসিফ ইসলাম শাওন ও ফজলুর রহমান রাজু ১৭:৩১ , অক্টোবর ১৩ , ২০১৭

খালেদা জিয়া (ছবি- সৈয়দ জাকির হোসেন/ঢাকা ট্রিবিউন)বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার দেশে ফেরা নিয়ে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব ও সমর্থকদের মধ্যে। আচমকা রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে পড়ার পাশাপাশি খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পরিপ্রেক্ষিতেই তৈরি হয়েছে এই উদ্বেগ। শুধু তাই নয়, দলটির অনেক নেতাই এখন বিভিন্ন কারণে চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েই শঙ্কায় রয়েছেন। খালেদা জিয়ার অসুস্থতা, হঠাৎ করেই বিএনপির বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থান এবং বিএনপির প্রধান মিত্র জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতাদের ধরপাকড়ে এই শঙ্কা আরও ঘনীভূত হয়েছে। এসব কারণেই বিএনপি নেতাদের অনেকেই আশঙ্কা করছেন, খালেদা জিয়ার বাংলাদেশে ফিরে আসতে আরও দেরি হতে পারে। একাধিক মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির ঘটনাকে খালেদা জিয়াকে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকেই বাইরে ঠেলে দিতে সরকারের চূড়ান্ত প্রচেষ্টা বলেও ধারণা করছেন কেউ কেউ।
বিএনপি নেতাদের অভিযোগ, দলটিকে আগামী নির্বাচনের বাইরে রাখার ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই বিচার বিভাগকে বিএনপির বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে সরকার। তাদের দাবি, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের চাপের মুখেই আদালত খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে।
গত এক সপ্তাহেই খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন তিনটি আদালত। বাসে অগ্নিসংযোগের ফলে আট জন নিহত হওয়ার ঘটনায় ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দায়ের করা একটি মামলায় গত সোমবার কুমিল্লার একটি আদালত জারি করেন প্রথম গ্রেফতারি পরোয়ানা। পরে বৃহস্পতিবার ঢাকার আরও দুইটি আদালত জিয়া আরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা ও আরেকটি মানহানির মামলায় তার নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন।
এসব গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হওয়ার পর বিএনপি এবং ২০ দলীয় জোটের দলগুলো ঢাকাসহ সারাদেশে জরুরি বৈঠক করেছে। দলীয় সূত্র বলছে, খালেদা জিয়া গ্রেফতার হলে দল বা ২০ দলীয় জোটের করণীয় কী হতে পারে, কেবল এই এজেন্ডা নিয়েই এসব বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বিএনপির কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল পর্যায়ের অনেক নেতা এবং সমর্থকরা বলছেন, ওই ধরনের পরিস্থিতি উদ্ভূত হলে কী ঘটবে, সে সম্পর্কে তাদের কোনও ধারণাই নেই।
উল্লেখ্য, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া চিকিৎসার জন্য গত জুলাই থেকেই অবস্থান করছেন লন্ডনে। সেখানে তার বড় বড় ছেলে ও দলটির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট তারেক রহমানের বাড়িতে আছেন তিনি। এর আগে তিন বার তিনি দেশে ফেরার উদ্যোগ নিলেও বিভিন্ন কারণে তার দেশে ফেরা হয়নি। এবারে আগামী ২২ অক্টোবর খালেদার দেশে ফেরার তারিখ ঠিক হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহ-সম্পাদক রুমিন ফারহানা। তবে এ বিষয়ে দলটির মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আলমগীর অবগত নন বলে জানিয়েছেন।
খালেদার বিকল্প ভাবছে বিএনপি!
এদিকে, খালেদা জিয়া যদি গ্রেফতার হয়েই যায়, সেক্ষেত্রে বিকল্প হিসেবে দলে কো-চেয়ারম্যান পদ তৈরির কথা ভাবা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন দলের একাধিক শীর্ষ নেতা। তারা বলছেন, প্রয়োজন হলে আগামী নির্বাচনের আগে কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত কোনও পরিস্থিতি তৈরি হলে ওই পদে তারেক জিয়া অথবা তার স্ত্রী জোবায়দা রহমানকে বসানো হতে পারে। দলের একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতার ভাষ্য, আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগেই ব্যাপক গণসংযোগের মাধ্যমে বিভিন্ন সংকটে থাকা দলটিকে ফের চাঙ্গা করে তোলার সক্ষমতা রাখেন জোবায়দা রহমান। ২০১৮ সালের শেষভাগে কিংবা ২০১৯ সালের শুরুতে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
বিএনপিকে আগামী নির্বাচনের বাইরে রাখতে সরকারের ষড়যন্ত্র প্রসঙ্গে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ভ্রান্ত ধারণার মধ্যে আছে। আমরা আগেও এ ধরনের ষড়যন্ত্রের মুখোমুখি হয়েছি। তবে বিএনপিকে ছাড়া কোনও নির্বাচন হলে তা দেশের মানুষ কিংবা আন্তর্জাতিক মহলের কাছে মোটেও গ্রহণযোগ্য হবে না।’
খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করার মতো সাহস সরকারের নেই বলে মনে করেন মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করা হলে জাতি তা মেনে নেবে না।’
কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক
খালেদা জিয়া দেশে না থাকলেও এর মধ্যে গত বুধবার সন্ধ্যায় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জার্মানিসহ কয়েকটি দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছেন বিএনপি নেতারা। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর কাছে সমর্থন চেয়েছে দলটি।
ওই বৈঠকে উপস্থিত থাকা রুমিন ফারহানা বলেন, সরকারের ষড়যন্ত্র নিয়ে বিএনপি মোটেও ভীত নয়। তিনি বলেন, ‘জনগণ আমাদের সঙ্গে আছে। তাই যেকোনও ধরনের ষড়যন্ত্র মোকাবিলার জন্য আমরা প্রস্তুত।’
খালেদা জিয়ার নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা
জিয়া আরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জারি হওয়া গ্রেফতারি পরোয়ানার বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের আইনজীবী মোশাররফ হোসাইন জানান, খালেদা জিয়া গত তিন মাসে শুনানিতে হাজির হননি। তিনি বলেন, ‘আদালতকে অবগত না করেই খালেদা জিয়া দেশের বাইরে গেছেন। ফলে বিচার প্রক্রিয়া চালিয়ে নিতেই আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন। পুলিশ এখন সেই নির্দেশ পালন করবে।’
তবে লন্ডন থেকে ফেরার পর খালেদা জিয়া আদালতে হাজিরা দেবেন বলে জানিয়েছেন বিএনপিপন্থী আইনজীবী ও সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জয়নুল আবেদীন। তিনি বলেন, ‘বিএনপির মতো বড় একটি রাজনেতিক দলের চেয়ারপারসন কখনও গ্রেফতার এড়ানোর জন্য পালিয়ে বেড়াবেন না।’
জয়নুল আবেদীন জানান, বৃহস্পতিবার বিকালেও স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য লন্ডনের এক চিকিৎসকের সঙ্গে সাক্ষাতের কথা ছিল খালেদা জিয়ার। আদালতকে বিষয়টি অবহিত করলেও আদালত সে আবেদন খারিজ করে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন বলে দাবি করেন জয়নুল আবেদীন। খালেদার সঙ্গে আলোচনার করে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে দলের জ্যৈষ্ঠ আইনজীবীরা বসবেন বলেও জানান তিনি।
ষড়যন্ত্র তত্ত্বের অভিযোগ অস্বীকার আওয়ামী লীগের
বিএনপির পক্ষ থেকে দলটির বিরুদ্ধে সরকারের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ করা হলেও সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দলটির নেতারা বলছেন, বিধি মেনেই আদালত গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন। এর মধ্যে কোনও ষড়যন্ত্র নেই।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাহমান বলেন, ‘এটা (খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা) আদালতের বিষয়। এর সঙ্গে আওয়ামী লীগের কোনও সম্পর্ক নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে আশাবাদী এবং আমরা চাই, বিএনপি এই নির্বাচনে অংশ নেবে।’
একই ধরনের কথা বলেন দলের সাংগঠনিক সম্পাদক মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলও। তরুণ এই আইনজীবী বলেন, ‘বিচার চলাকালে খালেদা জিয়া সব প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করলে আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করতো না।’
(ঢাকা ট্রিবিউনে প্রকাশিত)
আরও পড়ুন-
বিএনপি রাজপথে থেকে গ্রেফতারি পরোয়ানা প্রতিরোধ করবে: মঈন খান
খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে পরোয়ানা: সরকারের ‘এসিড টেস্ট’, বিএনপি বলছে ইস্যু বদলের কৌশল

Advertisement

Advertisement

Pran-RFL ad on bangla Tribune x