খালেদা জিয়াকে নিয়ে বিএনপির যে হিসাব

সালমান তারেক শাকিল ১২:০০ , ডিসেম্বর ০৭ , ২০১৭

খালেদা জিয়া (ফাইল ছবি)জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট ও জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায়ে দলীয় প্রধান খালেদা জিয়াকে জেলে যেতে হবে না বলে মনে করছে তার দল বিএনপি। এক্ষেত্রে আদালত যদি ‘রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত’ না হয়ে মামলার কাগজপত্র, সাক্ষী, তথ্য-প্রমাণ বিবেচনা করেন, তাহলে বিএনপির চেয়ারপারসন নিরঙ্কুশ খালাস পাবেন বলে আত্মবিশ্বাসী দলটির নেতারা।

বিএনপি নেতারা এও বলছেন, ‘খালেদা জিয়াকে দুর্নীতি মামলায় সাজা দেওয়ার পরিকল্পনা সরকারের তরফে হয়ে থাকলে তা আদতে তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধেই যাবে। এমনকি এর খারাপ প্রভাব পড়তে পারে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ওপর। ‘পাকিস্তান আমলেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে অনেক মামলার আসামি করা হয়েছিল এবং কোনও-কোনও মামলার রায়ে তিনি সাজাপ্রাপ্ত হলেও শেষ পর্যন্ত তা ওই রাষ্ট্রের সরকারের বিরুদ্ধেই গেছে’―এমন উদাহরণ টানেন নেতারা।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা বৈঠক করে তো কোনও ধারণা করি না। ব্যক্তিগতভাবে আমার ধারণা, যদি সুবিচার হয়, যেহেতু এই দুটি মামলায় কোনও শক্ত অভিযোগ নেই, সেজন্য এই মামলায় আদালত (খালেদা জিয়াকে) সাজা দিতে পারবেন না। সঠিক বিচার হলে সম্ভব না। যে কথা বলা হচ্ছে, এতিমের টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে, এটা তো ঘটেইনি। ম্যাটারিয়ালসের (বস্তুগত) দিক থেকে যদি বিচার করা হয়, তাহলে সাজা দেওয়া সম্ভব হবে না।’

বিএনপির নীতিনির্ধারকরা বলছেন, মামলার নানা দিক বিবেচনা করলে খালেদা জিয়া সাজা হওয়ার বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন নন। এরপরও নিম্ন আদালতের রায় তাদের প্রত্যাশার বিপরীতে গেলে আইনগত এবং রাজনৈতিক-দুই পথেই মোকাবিলা করার পরিকল্পনা রয়েছে দলটির। তবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথ ও দিক-নির্দেশনা নির্ধারণ করতে আগামীতে অনুষ্ঠিতব্য স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হতে পারে।

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুটি মামলা, মামলায় রায় ও সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ নিয়ে বিএনপির নীতিনির্ধারণী প্রায় দশজন নেতার সঙ্গে বাংলা ট্রিবিউনের কথা হয়। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আইনগত দিক নিয়ে পরিকল্পনা করছেন দলের বিজ্ঞ আইনজীবীরা। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলার জন্য দলের নেতৃত্ব, সাংগঠনিক কাঠামো ও বিদ্যমান গঠনতন্ত্রের আলোকেই বিএনপিকে সংঘবদ্ধ রাখা। কোনও-কোনও নেতার আশা, খালেদা জিয়াকে সাজা দেওয়ার চিন্তা করলে মৌলিকভাবে নেতাকর্মীরা প্রতিক্রিয়া দেখাবে এবং তার প্রতি আরও বেশি ঝুঁকবে। এছাড়া মামলা দুটি আইনগত ভিত্তি এতটাই দুর্বল যে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হবে এবং সেটি স্থায়ীও হবে। যার ফলাফল আগামী নির্বাচনে তীব্রভাবে পড়বে। 

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ মনে করেন, ‘নিরপেক্ষভাবে বিচার করা হলে খালেদা জিয়ার সম্পূর্ণভাবে খালাস পাবেন। তার বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি, (দুদক) করতে পারে নাই।’

আইনগতভাবে সাজা হওয়ার কোনও যৌক্তিকতা নেই উল্লেখ করে সাবেক এই আইনমন্ত্রী বলেন, ‘প্রথমত, সাক্ষীরা একেকজন একেক কথা বলেছেন। দ্বিতীয়ত, এই মামলা যে কারণে করা হলো অথচ কোনও কাগজে তার সই নেই, কোনও ব্যাংক চেকে সই নেই। তৃতীয়ত, বিএনপির চেয়ারপারসন এই ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য নন, ট্রাস্টের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা নেই, কোনও সম্পর্ক নেই। একটি ট্রাস্ট পরিচালনার জন্য যে লোকজন থাকে, তিনি সেখানেও নেই। এমনকি আদালতে তার সংশ্লিষ্টতা দেখাতে পারে নাই। প্রাকধারণার ওপরে কিভাবে সাজা হয়? বলে প্রশ্ন করেন মওদুদ আহমদ। 

বিএনপির চেয়ারপারসনের গণমাধ্যম বিভাগের কর্মকর্তা শায়রুল কবির খান বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ‘খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে এক-এগারো সরকারের সময়ে করা দুটি মামলা রয়েছে। এছাড়া রাজনৈতিকভাবে গত কয়েকবছরে তার বিরুদ্ধে আরও ১৪ টি মামলা হয়েছে।’

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা দুটি দুদকের করা। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আদালতে মোট ৩৭টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। পাঁচটি মামলা প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় দুর্নীতির অভিযোগে করা। দুর্নীতির মামলাগুলো এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় করা। বাকি মামলাগুলোয় গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, হত্যা, মানহানি ও রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে করা হয়েছে।

মামলা সম্পর্কে জানা গেছে, ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে করা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট এবং ৩ কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে করা জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়াসহ আরও কয়েকজন আসামি আছেন। এর মধ্যে অন্যতম তার বড় ছেলে তারেক রহমান।

মামলার আইনগত ভিত্তি ও খালেদা জিয়ার ওপর প্রভাব সম্পর্কে কথা বলেন তার আইনজীবী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার। তিনি বলেন, ‘মামলার বিচার যদি আইনের স্বাভাবিক গতিতে যায়, মামলার কাগজপত্র পড়ে যা দেখলাম, তাতে তার জেল হওয়ার কারণ নেই। তবে সম্পূর্ণরূপে আদালতের ওপর নির্ভর করছে। কোর্ট যদি মনের মতো মানে আইনমতো হয়, আমার বিশ্বাস খালেদা জিয়া দুটি মামলাতেই খালাস পাবেন।’

তবে খালেদা জিয়া আদালতের রায়ে সাজা হলেও বিএনপির আইনজীবীদের প্রস্তুতি রয়েছে। নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে দ্রুততার সঙ্গে উচ্চ আদালতে আপিল করার পরিকল্পনা রয়েছে নেতাদের। বিএনপি নেতাদের ভাষ্য, ‘যদি আদালত রায়ে জেল দেন, তাহলে জামিন চাওয়া হবে, আর জামিন পেলেই তিনি নির্বাচনের জন্য ফিট হবেন।’

সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার বিষয়টির ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আইন যা আছে, তাতে আপিল করলে জামিন পাবেন এবং জামিন পেলেই তিনি নির্বাচন করতে পারবেন।’

যুক্তিতর্ক ও ফ্যাক্টসের দিক থেকে তিনি বলেন, ‘আপিলটা ট্রায়াল কোর্টের কন্টিনিউশন। এটা শেষ না। আপিল কোর্টে যা হবে, এটাই ফাইনাল। যতক্ষণ না ফাইনাল হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আপনার জেল হয় নাই। জেল হিসেবে কাউন্ট হবে জাজমেন্টের পর।’

আইনের দিকটি বিবেচনায় নিয়ে জমির উদ্দিন সরকার যুক্ত করেন, ‘হাইকোর্টে আপিল কোর্টে যে বিচার হবে, আইনের দিক থেকে কিন্তু একই বিচার। তার ট্রায়াল তো শেষ হয় নাই। আপিল কোর্টে যতদিন কেসটা চলবে, ততদিন তিনি নির্বাচনে কনটেস্ট চলবে।’

‘ফলে এখন পর্যন্ত মামলার যে অবস্থা, সাক্ষী-প্রমাণ যা আসছে, তাতে তার সাজা দেওয়া খুব শক্ত’-বলে জোর দেন জমির উদ্দিন সরকার।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দীন খোকনের মত, ‘মামলার সাক্ষী ও প্রমাণে এত দুর্বলতা, তাতে করে খালেদা জিয়ার কোনও সাজাই হবে না। তিনি খালাস পাবেন।’

এদিকে, সম্ভাব্য রায় খালেদা জিয়ার পক্ষে না গেলে আইনের পাশাপাশি বিষয়টি রাজনৈতিকভাবেও মোকাবিলা করবে বিএনপি। এক্ষেত্রে  তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও জনপ্রিয়তার বিচারে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া অনেক বেশি তীব্র হবে বলে অনেক নেতা সতর্ক করেছেন।

বিএনপির নীতিনির্ধারকরা বলছেন, সাজা দেওয়া হলে পরবর্তী করণীয় নিয়ে বৈঠক করবেন স্থায়ী কমিটি, গুরুত্বপূর্ণ ভাইস চেয়ারম্যান, উপদেষ্টা, দলীয় বুদ্ধিজীবী ও সিনিয়র নেতারা। ওই বৈঠকেই পরবর্তী সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হবে।

স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘রাজনৈতিকভাবে সাজা দেওয়া হলে রাজনৈতিকভাবেই মোকাবিলা করবো। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে তিনটি মামলা ছিলো প্রমাণসহ। কিন্তু আমাদের ম্যাডামের ক্ষেত্রে তথ্য প্রমাণ না থাকলেও ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে। ফলে, শাস্তি দিলে আইনি ও রাজনৈতিক-দুটো পথেই মোকাবিলা করবো।’

খালেদা জিয়ার সাজা হলে তা দলের ওপর কেমন প্রভাব ফেলতে পারে জানতে চাইলে খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘কোনও প্রভাব পড়বে না। তাকে সাজা দেওয়া হলে আমরা হাইকোর্টে যাবো।’

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, ‘রাজনৈতিকভাবে সাজা দেওয়া হলে সেটার রি-অ্যাকশন কী হবে, সেটা তো এখনই বলা যাবে না। আমরা বসে ঠিক করবো।’

প্রায় একই মত ব্যক্ত করেন ভাইস চেয়ারম্যান ইনাম আহমেদ চৌধুরী। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘দল সিদ্ধান্ত নেবে পরবর্তী সিদ্ধান্ত কী হবে। এটা এমনও হতে পারে পরবর্তী স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও আলোচনা হতে পারে। আর কী পরিণতি হবে, এটা নিয়ে আলাদা চিন্তা করছি না, দলগতভাবে ঠিক করা হবে করণীয় কী হবে।’

ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলছেন খালেদা জিয়াকে সাজা দেওয়ার বিষয়টি আদালতের ওপর নির্ভর করলে তার কোনও সাজা হবে না। তবে যদি সাজা দেওয়া হয়, তাহলে প্রথমত এটা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধেই যাবে। আর এটা মোকাবিলায় তাৎক্ষণিক বৈঠকে ঠিক করব, কী হবে।

দুদু আরও বলেন, ‘খালেদা জিয়াকে সাজা দেওয়া হলে প্রভাব বিএনপিতে পড়বে না। পড়বে আওয়ামী লীগের ওপর। বড় ধরনের ক্ষতির শিকার হবে তারা। বেগম জিয়াকে তারা রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা না করে মামলা দিয়ে মোকাবিলা করছে। মাইনাস ওয়ান ফর্মূলা নিয়ে সরকার এগিয়ে গেলেও লাভ হবে না।’

উদাহরণ দিতে গিয়ে দুদু বলেন, ‘পাকিস্তান সরকারও শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা করেছিল, কোনও কোনও মামলার রায়ও হয়েছিল, কিন্তু লাভ হয়নি। ফলাফল পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধেই গেছে। শেষ বিচারে যারা এগুলো করেছিল তাদের পরিণতি ভালো হয়নি। ফলে, বেগম জিয়ার সঙ্গে এমন আচরণ করার আগে আওয়ামী লীগকে ভাবতে হবে।’

বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ বলেন, ‘এই মামলা তো যেকোনও একজন নাগরিকের বিরুদ্ধে মামলা না, দেশনেত্রীর বিরুদ্ধে মামলা। আর খালেদা জিয়ার ভাগ্য আর বাংলাদেশের ভাগ্য একইসূত্রে গাঁথা। সেখানে তার মতো একজন রাজনীতিবিদ, একটি জনপ্রিয় দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন; তাকে মিথ্যে মামলায় জেলে নেবে, এটা বাংলাদেশের  ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত। সুতরাং আদৌ আমরা মনে করি না, প্রমাণিত হয়নি এমন মামলায় তাকে জেলে নেওয়া হবে।’

খালেদা জিয়ার মামলা, এর সম্ভাব্য রায় ও রাজনৈতিক পর্যালোচনা নিয়ে কথা হয় বিএনপির রাজনীতির গভীর পর্যবেক্ষক ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি মনে করেন, ‘বিচারক যদি বিবেক অনুযায়ী বিচার করেন, তাহলে খালেদা জিয়া খালাস পাবেন। যদি অন্য জায়গা থেকে হুকুমনামা আসে, তাহলে হুকুমনামা মেনে চলেন, আর খালেদা জিয়া শক্ত পায়ে দাঁড়াতে না পারেন, তাহলে ভিন্ন একটা রায় আসতে পারে।’

ফলে এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিএনপির অবস্থান কী হওয়া উচিত, এমন প্রশ্নে জাফরুল্লাহ চৌধুরীর ভাষ্য, ‘বিএনপির চেয়ারপারসন তো আমার পরামর্শ শোনেন না। তবে তাকে দেরি না করে, পার্টিকে সংগঠিত করতে দেশ সফরে বেরিয়ে যাওয়া উচিত। যে কতদিন তিনি আছেন, মামলা সুরাহার হওয়ার আগেই দেশ পরিভ্রমণে বেরিয়ে যাওয়া উচিত। নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা উচিত।’

 আরও পড়ুন:
স্বৈরাচার এরশাদও এত খারাপ ছিলেন না: ফখরুল

/এসটিএস/টিএন/

x