নির্বাচনি বছরে বিএনপিকে নিয়ে কী ভাবছে দিল্লি?

রঞ্জন বসু, দিল্লি ২১:৫৯ , জুন ১৪ , ২০১৮

 

বিএনপিসংসদের বাইরে থাকা প্রধান বিরোধী দল বিএনপির দীর্ঘদিনের ভারতবিরোধী অবস্থানে পরিবর্তন আসবে কিনা, তা নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই বিস্তর জল্পনা-কল্পনা চলছে।  তবে বাংলাদেশের নির্বাচনের এই গুরুত্বপূর্ণ বছরে দিল্লিতে নীতি-নির্ধারকরা বিএনপি সম্পর্কে তাদের মনোভাব রাতারাতি বদলে ফেলেছেন, তেমন কোনও ইঙ্গিত এখনও নেই।

এই প্রসঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেন, ‘বিএনপি যে ভারতকে নিয়ে নতুন করে ভাবতে চায়, সে ইঙ্গিত প্রথম দিয়েছিলেন দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া নিজেই। ২০১২ সালের অক্টোবরে বিরোধী দলীয় নেত্রী হিসেবে তিনি যখন ভারত সফরে যান, তখনই দিল্লিকে কথা দিয়ে আসেন, ক্ষমতায় এলে বিএনপি কিছুতেই আর বাংলাদেশের মাটিকে ভারতবিরোধী কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হতে দেবে না। ভারতও কিন্তু সেই কথায় অবিশ্বাস করেনি।’

এমনকি খালেদা জিয়ার সরকারের পুরনো ট্র্যাক রেকর্ড ভুলে গিয়ে ভারত কীভাবে শুধু তার মুখের কথায় ভরসা রাখছে, এ প্রশ্নের জবাবে তখন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন মুখপাত্র সৈয়দ আকবর উদ্দিন বলেছিলেন, ‘যা ঘটেছে, তা ঘটে গেছে, আমরা এখন আর গাড়ির রিয়ার ভিউ মিররে তাকাতে রাজি নই!’    

এরপর গঙ্গা-বুড়িগঙ্গা—দুই নদী দিয়েই অনেক জল গড়িয়েছে। ঘটনার গতিপ্রকৃতি যেভাবে এগিয়েছে, তাতে ভারতকেও বিএনপি প্রসঙ্গে পেছনের আয়নায় তাকাতেই হয়েছে। দিল্লি সফর করে যাওয়ার পরের বছরেরই খালেদা জিয়া ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জীর সঙ্গে ঢাকায় দেখা করতে অস্বীকার করেন। সেই ঘটনা দুই পক্ষের সম্পর্ককে আবার তলানিতে ঠেলে দেয়।

জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক নিয়েও যেহেতু ধোঁয়াশা রয়েই গেছে, সেহেতু ভারতও কখনও খালেদা জিয়ার দলকে নিয়ে পুরোপুরি সন্দেহমুক্ত হতে পারেনি।

তবু এটা অস্বীকার করা যাবে না, ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি সরকার ভারতের ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বিএনপি দিল্লির সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক গড়ার প্রয়াস শুরু করে। যে উদ্যোগের পেছনে ছিল তারেক রহমানের প্রচ্ছন্ন সমর্থন। সে কারণেই গত চার বছরে বিএনপির নানা স্তরের নেতারা প্রতিনিয়ত দিল্লি আসা-যাওয়া করেছেন, বিজেপিসহ বিভিন্ন দলের রাজনীতিকদের সঙ্গে ও নানা থিংকট্যাংকের গবেষকদের সঙ্গে মতবিনিময়ও চালিয়ে গেছেন।

কিন্তু এতে আখেরে কতটা লাভ হলো? বিএনপি সম্পর্কে দিল্লির ভাবনা কি আদৌ পাল্টালো?

বিজেপির সিনিয়র নেতা ও বর্তমানে উত্তরপ্রদেশের ক্যাবিনেটমন্ত্রী সিদ্ধার্থনাথ সিং বহুদিন দলের হয়ে পশ্চিমবঙ্গের দাযিত্বে ছিলেন। সেই সুবাদে বাংলাদেশের রাজনীতির দিকেও তাকে নজর রাখতে হতো। তিনি এই প্রতিবেদককে বলছিলেন, ‘দেখুন, আওয়ামী লীগ হলো আমাদের টেস্টেড ও ট্রাস্টেড ফ্রেন্ড—অর্থাৎ কিনা পরীক্ষিত বন্ধু, ভরসা করার মতো বন্ধু। বিএনপি ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চাইছে সেটা অবশ্যই ইতিবাচক ব্যাপার, কিন্তু আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাদের কোনও তুলনাই হতে পারে না। তুলনা করার মতো জায়গায় আসতে হলেও তাদের এখনও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে, বিএনপিকে প্রমাণ করতে হবে, তাদের কথায় ও কাজে কোনও অমিল নেই!’    

বিজেপি নেতৃত্বের এই ধরনের কথাবার্তা থেকেই বোঝা যায়, বিএনপি সম্পর্কে তাদের অবিশ্বাস এখনও পুরোপুরি যায়নি। কিন্তু পাশাপাশি এ কথাও ঠিক, তারা অনেকেই মনে করেন বাংলাদেশে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন হলে বিএনপি বেশ ভালো করতে পারে। কাজেই তাদের একেবারে উড়িয়ে দেওয়া বা উপেক্ষা করাও সমীচীন হবে না।

সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক বীনা সিক্রি বিএনপি-জামাত শাসনামলে বেশকিছু দিন  ঢাকায় ভারতীয় হাই কমিশনারের দায়িত্ব পালন করেছেন।  তিনি যদিও স্বীকার করেন, সে সময় দুদেশের সম্পর্কে বড়সড়ো ফাটল ধরেছিল। তাই বলে বিএনপির সঙ্গে দিল্লির সম্পর্ক কখনোই জোড়া লাগবে না, এই মতেও তিনি বিশ্বাস করেন না। এই প্রসঙ্গে বীনা সিক্রি বলেন, ‘দেখুন, কূটনীতিতে নাথিং ইস স্ট্যাটিক। আজ বিএনপি যদি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশে ক্ষমতায় আসে এবং ভারতের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িযে দেয়, আমি নিশ্চিত দিল্লিতে যেকোনও সরকারই তা গ্রহণ করবে। তবে, তার আগে বিএনপিকেও দেখাতে হবে যে, কোনও মৌলবাদী শক্তির সঙ্গে তাদের আঁতাত নেই এবং অতীত ভুলে তারাও সত্যিই ভারতের সঙ্গে নিখাদ বন্ধুত্বই চায়।’ 

সোজা কথায়, বিএনপি ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক সহজ করে তুলতে চাইলেও এখনপর্যন্ত দিল্লি তার মধ্যে অনেক শর্ত গুঁজে দিতে চায়। 

বস্তুত ভারত যে আগামী নির্বাচনে বিএনপির ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন দেখতে প্রস্তুত নয়, সেটা কিছুটা রাখঢাক করে বলেই ফেললেন দিল্লির সুপরিচিত থিংকট্যাংক ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালিসিসের গবেষক ড. স্মৃতি পট্টনায়ক। তিনি বলছেন, ‘শেখ হাসিনার বর্তমান সরকার যে মোটামুটি বিনা বাধায় পুরো মেয়াদ শেষ করতে পারছে, তার পেছনে ভারতের যে একটা বিরাট ভূমিকা আছে, এ কথা ঢাকা ও দিল্লিতে অনেকেই জানেন ও মানেন। কিন্তু একই রকম পরিস্থিতিতে বিএনপির ক্ষমতায় আসার ক্ষেত্র প্রস্তুত হলে ভারত আগাগোড়া একইভাবে অকুণ্ঠ সমর্থন দিতে তৈরি থাকবে। আমি সে ব্যাপারে নিশ্চিত নই!’     

এরপরও ভারতের শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিক বা নীতি-নির্ধারকদের সঙ্গে বিএনপির যে একটা যোগাযোগের সেতু ধীরে ধীরে হলেও তৈরি হয়েছে, তাতে কোনও সংশয় নেই।

যদিও ভারতের এক শীর্ষস্থানীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তার কথায়, ‘এই বৈঠকগুলো যতটা সম্ভব আড়ালে রাখারই চেষ্টা হয়।’ আর তার কারণটাও খুব সহজ। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী হাসিনার কানে পৌঁছলে তিনি এগুলোকে মোটেও সহজভাবে নেন না। আর তাকে খামোখা চটানোর ঝুঁকি নেওয়ার কথা ভারত এখনও দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারে না। এবং বিএনপি আর দিল্লির বন্ধুত্বের পথে সবচেয়ে বড় বাধা সেটাই। আওয়ামী লীগ এই দরজার প্রায় পুরোটা জুড়ে আছে বলেই শত চেষ্টা সত্ত্বেও বিএনপি সেই ফাঁক গলে ঢুকতে হিমশিম খাচ্ছে!    

/এমএনএইচ/

x