বিএনপির পোলিং এজেন্ট: বিতাড়িত না গরহাজির?

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট ২২:৫৪ , জুন ২৬ , ২০১৮


গাজীপুর সিটি নির্বাচনে ভোটারদের দীর্ঘ লাইন। ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
গাজীপুর সিটি নির্বাচনে এবার আলোচনায় ছিল পোলিং এজেন্ট। বিএনপির প্রার্থী দাবি করেছেন, শতাধিক কেন্দ্র থেকে তাদের পোলিং এজেন্ট বের করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী দাবি করেছেন, তারা অনেক কেন্দ্রেই পোলিং এজেন্ট দেননি। তাহলে বাস্তবে কী ঘটেছে?
সরেজমিন দেখা গেছে, মঙ্গলবার সকালে ভোট শুরুর পর নোয়াগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে (৪৬ নং ওয়ার্ড) কেন্দ্রে ভোটারদের লম্বা লাইন ছিল। সেখানে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থীর পক্ষে পোলিং এজেন্ট ছিলেন। কিন্তু বিএনপির মেয়র প্রার্থীর পক্ষে কোনও পোলিং এজেন্ট দেখা যায়নি।
সেখানে উপস্থিত আওয়ামী লীগের এজেন্টরা জানান, বিএনপির পক্ষে কোনও এজেন্ট কেন্দ্রে আসেননি। কেন্দ্রটির প্রিসাইডিং অফিসার বদিউল আলমও জানান, বিএনপির কোনও এজেন্ট কেন্দ্রে আসেননি। দুপুরে আবারও ওই কেন্দ্র পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, তখনও বিএনপির কোনও এজেন্ট আসেননি।

ভোট কেন্দ্রের বাইরে নারীদের দীর্ঘ লাইন
সকাল সাড়ে ৮টার দিকে টঙ্গীর ৫৪ নং ওয়ার্ডের বসির উদ্দিন উদয়ন একাডেমি পুরুষ কেন্দ্রে ভোট দিয়েছেন বিএনপির মেয়র প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার। ওই কেন্দ্রে তখন বিএনপির পোলিং এজেন্ট ছিল। এরপর দুপুর ২টা পর্যন্ত আরও ১২টি কেন্দ্র সরেজমিন ঘুরে মাত্র ২টি কেন্দ্র ছাড়া আর কোথাও দলটির পোলিং এজেন্ট পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কোনও কোনও কেন্দ্রে এজেন্ট আসেনইনি। আবার কোনও কোনও কেন্দ্রে পোলিং এজেন্ট কিছুক্ষণ থেকে চলে যান।  

ব্যালট পেপার নিচ্ছেন একজন প্রবীণ ভোটার
সকাল ১০ টায় কোনাবাড়ীর গ্রেটম্যাট প্রাইমারি স্কুলে স্থাপিত ৬২ নম্বর ভোটকেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে বিএনপির কোনও পোলিং এজেন্ট নেই। এ বিষয়ে কেন্দ্রটির প্রিসাইডিং অফিসার দবিরুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কেন্দ্রে বিএনপির এজেন্ট নেই কেন, এটা তো আমি বলতে পারবো না। কেন তারা কেন্দ্রে আসেননি, সেটা তাদের প্রার্থী বলতে পারবেন।’

কোনাবাড়ীর আইডিয়াল হাইস্কুলে স্থাপিত ৬০ নম্বর কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার মাহমুদুল আমিন একই প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘এ কেন্দ্রে সকালে বিএনপির কোনও পোলিং এজেন্ট কার্ড নিতেও আসেননি। এছাড়া সব প্রার্থীর এজেন্ট এসে কার্ড নিয়ে গেছেন এবং তারা কেন্দ্রে আছেন।’

পারিজাত কোনাবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্থাপিত ৫৭ নম্বর কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার শামসুদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমিও এসে বিএনপির কোনও পোলিং এজেন্ট পাইনি।’
মোহাম্মদীয়া ইসলামিয়া কওমি মাদ্রাসা ৫৮ নম্বর মহিলা কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার রাহাতুল ইসলাম বলেন, ‘সকালে ৪টি ভোটের বুথের মধ্যে ৩টিতে বিএনপির পোলিং এজেন্ট ছিল,  কিন্তু ১২ টার পরে তারা চলে যায়।’
গাজীপুরে মোট কেন্দ্র ৪২৫ টি। মোট ভোটার ১১ লাখ ৩৭ হাজার ৭৩৬ জন।

ইভিএমে ভোট দেওয়ার পদ্ধতি একজন নারী ভোটারকে বুঝিয়ে দিচ্ছেন সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার
আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলমের মিডিয়া সেলের প্রধান মো. আলম বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ‘গাজীপুরের ৫৭টি ওয়ার্ডের ৪২৫টি ভোট কেন্দ্রে ৫ হাজার ৫২২ জন নৌকা প্রতীকের পোলিং এজেন্ট দায়িত্ব পালন করেছেন।’
বিএনপির মেয়র প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকারের ব্যক্তিগত সহকারী জনি কিবরিয়া খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গাজীপুরে ৪২৫ টি কেন্দ্রে ২৭ শ’ ৬২টি ভোটের বুথ ছিল। প্রতিটি কেন্দ্রে একজন করে আমাদের পোলিং এজেন্ট ঠিক করা ছিল। কিন্তু সকাল থেকে বিভিন্ন কেন্দ্রে গিয়ে পুলিশ ৩শ’ থেকে ৪শ’ জনকে গ্রেফতার করেছে। ফলে কোনও কোনও কেন্দ্রে এজেন্ট ছিল না।’  
তার কাছে এজেন্টদের তালিকা চাইলে তিনি তা দেখাতে পারেননি। তিনি দাবি করেন, ‘এ তালিকা আমাদের মিডিয়া প্রধানের কাছে ছিল। কিন্তু সকাল থেকে তার কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।’
বিএনপির মেয়র প্রার্থী হাসান সরকার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের সব কেন্দ্রের এজেন্ট ঠিক করে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সকাল থেকে বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে অনেককে বের করে দেওয়া হয়েছে। সকালে বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে পুলিশ ৪শ’র বেশি এজেন্টকে আটক করেছে। এর মধ্যে সন্ধ্যায় অনেকে ছেড়ে দিয়েছে।’
এর জবাবে গাজীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাসেল শেখ বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ‘বিএনপির একজন পোলিং এজেন্টকেও আটকের ঘটনা ঘটেনি। আমাদের কাছে কেউ অভিযোগও করেনি।’
আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘জোর করে পোলিং এজেন্ট বের করে দেওয়ার কোনও অভিযোগ আমরা পাইনি। এ ধরনের ঘটনা যদি ঘটেই থাকে তাহলে দুয়েকটি সংঘর্ষের খবর তো পেতাম। কিন্তু বিএনপির পোলিং এজেন্টদের ওপর হামলা বা সংঘর্ষের খবর পাইনি।’  
আওয়ামী লীগ মেয়র পদ প্রার্থী অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, 'বিএনপির পোলিং এজেন্টরা কেন্দ্রে যায়নি। এ বিষয়ে আমার কাছে অনেক প্রমাণ আছে। সেগুলো এখন দিতে পারবো না, কারণ নির্বাচনি আচরণ বিধি লঙ্ঘন করা হবে। তবে ভোট গণনার পর আমি এগুলোর প্রমাণ দিতে পারবো।'

ভোট দিচ্ছেন একজন নারী ভোটার
বিএনপি শতাধিক কেন্দ্রে পোলিং এজেন্ট বের করে দেওয়ার অভিযোগ করলেও কোনও পোলিং এজেন্টকে মারধর বা শক্তি প্রয়োগের অভিযোগ করা হয়নি।
স্থানীয় সূত্র জানায়, পোলিং এজেন্ট দেওয়ার ব্যাপারে বিএনপি প্রার্থীর মধ্যে কোনও জোর তৎপরতা লক্ষ করা যায়নি। আর যাদের দেওয়া হয়েছিল, তারাও যে কেন্দ্রে শক্তভাবে অবস্থান করতে চেয়েছেন, তাও দৃশ্যমান হয়নি।
বাংলা ট্রিবিউনকে রিটার্নিং অফিসার রকিব উদ্দিন মণ্ডল জানান, ‘ফোনে হাসান উদ্দিন সরকার অভিযোগ করলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেই। তবে বিএনপির শতাধিক পোলিং এজেন্টকে কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি।’
গাজীপুর ভাষা শহীদ কলেজের অধ্যক্ষ মুকুল কুমার মল্লিক বলেন, ‘আমি শুনেছি, বিএনপির প্রার্থী ৪২৫টি কেন্দ্রের সবকটিতে পোলিং এজেন্ট দিতে পারেনি বা দেননি। তবে দুপুরে বিএনপির প্রার্থী অভিযোগ করেছেন শতাধিক কেন্দ্র থেকে তাদের এজেন্ট বের করে দেওয়া হয়েছে। তারা এজেন্ট দিতে পারেননি, নাকি এজেন্টদের বের করে দেওয়া হয়েছে, এর সত্যতা নির্ধারণের জন্য সরেজমিন অনুসন্ধান প্রয়োজন।’

৩৫ নম্বর ওয়ার্ডের কলমেশ্বর এলাকার হাজী আহম্মদ আলী পাবলিক স্কুল ভোট কেন্দ্রে (মহিলা) ৮টি কক্ষে ভোট নেওয়া হয়। এ কেন্দ্রের ৫টি কক্ষে ধানের শীষের এজেন্ট পাওয়া গেছে।
৩৫ নম্বর ওয়ার্ডের কলমেশ্বর এলাকার হাজী তাজউদ্দিন মৃধা হাইস্কুলে ৮টি কক্ষে ভোট গ্রহণ করা হয়। এ কেন্দ্রে ধানের শীষ প্রতীকের কোনও পোলিং এজেন্ট পাওয়া যায়নি।
এই ভোটকেন্দ্রের সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার জালাল উদ্দিন জানান, অন্য মেয়র প্রার্থীদের পোলিং এজেন্টরা আসেনি। তবে নৌকা প্রতীকের এজেন্টরা আছে। ধানের শীষ প্রতীকের এজেন্ট নেই।
৩৮ নম্বর ওয়ার্ডের গাছা এলাকার খাইলকৈর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রে-১ (পুরুষ) ৫টি কক্ষে ভোট নেওয়া হয়। এই কেন্দ্রে নৌকা প্রতীক ও ধানের শীষ প্রতীকের পোলিং এজেন্টদের পাওয়া গেছে। এ কেন্দ্রে প্রিজাইডিং অফিসার এস এম ইমরান হোসেন জানান, সকাল থেকে শান্তিপূর্ণ ভোট গ্রহণ চলছে। সব প্রার্থীর পোলিং এজেন্টরা আছে।
৩৮ নম্বর ওয়ার্ডের গাছ এলাকার খাইলকৈর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্র-২ (মহিলা)-এর ৫টি কক্ষে ভোট গ্রহণ হয়। এখানে ধানের শীষ প্রতীকের পোলিং এজেন্টদের পাওয়া গেছে। এই কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার মো. রেজাউল হক জানান, এখানে সব প্রার্থীর পোলিং এজেন্ট রয়েছে। কোনও বিশৃঙ্খলা নেই।
৫১ নম্বর ওয়ার্ডের টঙ্গীর খরতৈল এলাকার আশা মডেল স্কুল ভোটকেন্দ্রে (মহিলা) ৬টি কক্ষে ভোট গ্রহণ চলে। এই কেন্দ্রে ধানের শীষ প্রতীকের পোলিং এজেন্ট উপস্থিত ছিল।
৫১ নম্বর ওয়ার্ডের খরতৈল এলাকার বিকাশ স্কুল ভোট কেন্দ্রে ৬টি কক্ষে ভোট গ্রহণ হয়। এই কেন্দ্রেও ধানের শীষ প্রতীকের পোলিং এজেন্ট উপস্থিত ছিল।
৫৬ নম্বর ওয়ার্ডের আমজাত আলী সরকার পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়-১ (পুরুষ) ভোটকেন্দ্রে নৌকা প্রতীক ও ধানের শীষ প্রতীকের পোলিং এজেন্টরা উপস্থিত ছিল।
৫৬ নম্বর ওয়ার্ডের আমজাত আলী সরকার পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়-২ (মহিল) ভোটকেন্দ্রেও ধানের শীষ প্রতীক ও নৌকা প্রতীকের পোলিং এজেন্ট ছিল।
৫৬ নম্বর ওয়ার্ডের আমজাত আলী সরকার পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়-৩ (পুরুষ ও মহিলা) ভোটকেন্দ্রের নৌকা প্রতীক ও ধানের শীষ প্রতীকের পোলিং ছিল।
৫৭ নম্বর ওয়ার্ডের টঙ্গীর সিরাজ উদ্দিন সরকার বিদ্যানিকেতন ও কলেজ-১ ও ২ দুটি কেন্দ্রেও সব প্রার্থীর পোলিং এজেন্ট উপস্থিত ছিল।
৫৭ নম্বর ওয়ার্ডের ভরান এলাকার খান আইডিয়াল স্কুল ভোটকেন্দ্র, টঙ্গীর আশরাফ মিলস হাইস্কুল ভোটকেন্দ্র, ধানের শীষ এজেন্টদের উপস্থিতি দেখা গেছে।


( বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদক চৌধুরী আকবর হোসেন, আদিত্য রিমন, শেখ জাহাঙ্গীর আলম ও গাজীপুর প্রতিনিধি রায়হানুল ইসলাম আকন্দের পাঠানো তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।)

/আরজে/জেইউ/এইচআই/টিএন/

x