বিএনপিকে ছাড়তে চায় না জামায়াত, নাম বদলের প্রস্তাব শুরা সদস্যদের

সালমান তারেক শাকিল ১১:৫১ , ফেব্রুয়ারি ১২ , ২০১৯

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী

বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট ছেড়ে আসার বিষয়ে কোনও সিদ্ধান্ত নেয়নি জামায়াতে ইসলামী। সারা দেশে ১৩টি অঞ্চলে বিভক্ত হয়ে দলটির কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার সর্বশেষ বৈঠকে দলের বর্তমান নাম পরিবর্তনের বিষয়ে প্রস্তাব দিয়েছেন শুরা সদস্যরা। পাশাপাশি শুরার ওই বৈঠকেই উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করারও সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এরইমধ্যে সেই সিদ্ধান্ত সারা দেশে নির্বাচনে আগ্রহী নেতাকর্মীদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। ঢাকা, সিলেট ফেনী ও খুলনা জেলার কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার পাঁচ জন সদস্য বাংলা ট্রিবিউনকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

জামায়াতের শুরা সদস্যরা জানান, গত জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে মজলিসে শুরার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পরিস্থিতির কারণে একসঙ্গে এই বৈঠক করতে না পারায়, সারা দেশের ১৩টি অঞ্চলে পৃথক-পৃথকভাবে একইদিনে শুরার সদস্যরা বৈঠক করেন এবং লিখিত আকারে তাদের মতামত কেন্দ্রে পাঠিয়েছেন।

শুরার সদস্যরা আরও  জানান, তাদের সর্বশেষ বৈঠকটি হয় বিশেষ কারণে। আসন্ন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দলের নির্বাহী পরিষদে মতবিরোধ দেখা দেয়। ফলে আমির মকবুল আহমাদ এ বিষয়ে শুরা সদস্যদের মতামত নেওয়ার নির্দেশ দেন। এই বৈঠকেই উপজেলা নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত দেন শুরার সদস্যরা। একই বৈঠকে জামায়াতের বর্তমান নাম পরিবর্তন করার প্রস্তাবও করেন সদস্যরা। তবে কোনও কোনও সদস্য দলের নাম বদলের বিষয়ে বিপক্ষে প্রস্তাব করেন। এই প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদে, সেখানেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।

ফেনী জেলা জামায়াতের নব নির্বাচিত আমির একেএম শামসুদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সর্বশেষ মজলিসে শুরার বৈঠকে আমি উপস্থিত ছিলাম না। আমি বৈঠক সম্পর্কে জেনেছি, সেখানে শুরার সদস্যরা দলের বর্তমান নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব করেছেন। নির্বাহী পরিষদে আমাদের প্রস্তাব গেছে, তারাই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করবেন।’

শামসুদ্দিন জানান, জানুয়ারি মাসের ১৬ বা ১৭ তারিখ শুরার বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছে।

মজলিসে শুরার সদস্যরা জানান, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে বেশির ভাগ সদস্য ‘জামায়াতে ইসলামী’ নাম পরিবর্তনের পক্ষে প্রস্তাব করেন। এখন কী নামে আসবে, কবে নাগাদ নতুন নাম নির্ধারণ করা হবে— এসব বিষয় কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের প্রশ্নে এরইমধ্যে সরকারের তরফে দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর বিচার করার বিষয়টি উত্থাপিত হয়েছে। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানিয়েছেন, ‘প্রয়োজনে আইন সংস্কার করে বিচার করা করা হবে।’

এ বিষয়ে জামায়াতের শুরা সদস্য, সিলেটের আঞ্চলিক পরিচালনা কমিটির সদস্য মাওলানা হাবিবুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সরকার তো অনেক আগে থেকে জামায়াতের বিচার করার কথা বলছে। আমরা ব্যস্ত আমাদের সাংগঠনিক কাজ নিয়ে। এসব নিয়ে ভাবছি না।’

কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করছি। আইনি পথেই মোকাবিলা করবো। তবে আমার মনে হয় না, সরকার জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেবে। জামায়াত দেশের প্রত্যেকটি সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেছে।’

উল্লেখ্য, নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন নিয়ে উচ্চ আদালতে জামায়াতের আপিল বিচারাধীন অবস্থা আছে।

জামায়াতের মজলিসে শুরার সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সর্বশেষ অনুষ্ঠিত শুরার বৈঠকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট ছেড়ে আসার বিষয়ে কোনও সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি।

দলটির নেতারা বলছেন, জামায়াতে ইসলামী নিজে জোট থেকে বেরিয়ে আসবে না। এ দায় তারা নিতে চাইছে না। জোট ভাঙতে হলে এবং জোটে জামায়াতের যে প্রয়োজন নেই— একথা বিএনপিকেই আগে বলতে হবে। সেক্ষেত্রে জোট ত্যাগ করার চিন্তা করবে জামায়াত।

কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার সদস্য প্রকৌশলী গোলাম মোস্তফা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামী এখনও পর্যন্ত বিএনপি জোট ছাড়ার কোনও সিদ্ধান্ত নেয়নি। বিএনপিকে আমরা ছাড়বো না। তারা যদি মনে করে, জোটের দরকার নেই, তাহলে আমরা সরে যাবো। আমাদের মধ্যে এ নিয়ে কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি।’

সর্বশেষ মজলিসে শুরার বৈঠক কবে অনুষ্ঠিত হয়েছে, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘জানুয়ারির মাঝামাঝি। এই বৈঠক আমার এলাকায় হয়েছে, সেখানে আমিও ছিলাম। সেখানে জোট ছাড়া বা এসব নিয়ে আলোচনা হয়নি।’

সিলেটে দলের আঞ্চলিক কর্মকাণ্ড পরিচালনাকারীদের মধ্যে একজন— মাওলানা হাবিবুর রহমান। সিলেট জেলা দক্ষিণের সদ্য সাবেক এই আমির বলেন, ‘বিএনপি ছাড়লে ছাড়তে পারে, জামায়াত (জোট) ছাড়বে না। যেভাবে আগাচ্ছি, সেভাবেই চলছে সবকিছু।’

এব্যাপারে জানতে চাইলে অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের সময় আলোচনা ছিল— ২০ দলীয় জোট-তো নির্বাচনি জোট, আন্দোলনের জোট। বিএনপি জোটেই আছে জামায়াত। আমরা তো উপজেলা নির্বাচনে যাচ্ছি না, এটাতো জোটের সিদ্ধান্ত। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ছাড়ার ব্যাপারে  জামায়াতে কোনও আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি। মজলিসে শুরায় এ বিষয়ে কোনও মত আসেনি।’

জামায়াতকে ছাড়ার ব্যাপারে জাতীয়তাবাদী ঘরানার বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘জামায়াতকে ছাড়ার ব্যাপারে তো আলোচনা আছেই। ঐক্যফ্রন্ট রেখেতো তাদের রাখা যায় না।’

এক প্রশ্নের জবাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই উপাচার্য বলেন, ‘নাম যদি পরিবর্তন করে, তাহলে তো হলোই। কিন্তু এই নাম নিয়ে আর কত। আমাদের বলা হয় বিএনপি জামায়াতপন্থী। আমরা তো তা না।’

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জামায়াত নতুন নামে আসতে চায় বা না চায়, তাদের প্রথম কাজ— লুকোচুরি না করে একাত্তরের ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়া। এরপর নতুন নামে নতুনভাবে রাজনীতি শুরু করা।’

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার বলেন, ‘বিএনপিকে জামায়াত ছাড়তে চায়, এমন কোনও খবর আমার কাছে নাই।’ এ বিষয়ে জোটের সমন্বয়ক নজরুল ইসলাম খানকে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

স্থায়ী কর্মসূচির চতুর্থ দফা স্থগিত করেছে জামায়াত

জামায়াতের সিলেট বিভাগের একটি জেলার আমির জানিয়েছেন, দলের গঠনতন্ত্রের ছয় ধারার স্থায়ী কর্মসূচির চার নম্বর দফা স্থগিত করা হয়েছে।

জামায়াতের গঠনতন্ত্রের ছয় নম্বর ধারার চার নম্বর দফায়  বলা হয়েছে, ‘গণতান্ত্রিক পন্থায় সরকার পরিবর্তন এবং সমাজের সর্বস্তরে সৎ ও চরিত্রবান লোকের নেতৃত্ব কায়েমের চেষ্টা করা।’

ঢাকার আলিয়া মাদ্রাসার ছাত্র শিবিরের সাবেক এক নেতা এ বিষয়টি জেনেছেন বলে বাংলা ট্রিবিউনকে জানান। উল্লেখ্য, গত দুই বছর আগেও এই ধারাটি স্থগিত করেছিল জামায়াত, এমন তথ্য দিয়েছেন সিলেটের একজন নেতা।

সারা দেশে জেলা আমির নির্বাচিত

জামায়াতের শুরা সদস্য ও কয়েকজন জেলা আমির জানান, সারা দেশের বেশিরভাগ জেলায় জামায়াতের আমির নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরপরই নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হয়। এরইমধ্যে নির্বাচিত আমিররা শপথ গ্রহণ করেছেন।

জেলা পর্যায়ে কথা বলে কয়েকটি জেলার নতুন আমিরদের নাম জানা গেছে। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য বলছে— সারা দেশে জামায়াতের প্রায় ৭৮টি সাংগঠনিক জেলা রয়েছে। গত এক বছরে এই সংখ্যা আরও  বাড়তে পারে, এমন সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন গাজীপুর জেলার একজন দায়িত্বশীল নেতা।

সিলেট জেলা দক্ষিণের আমির নির্বাচিত হয়েছেন অধ্যাপক আবদুল হান্নান, উত্তরে হাফেজ মাওলানা আনোয়ার হোসেন পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। সিলেট মহানগরীর আমির নির্বাচিত হয়েছেন অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। সিলেট দক্ষিণ জেলার সাবেক আমির মাওলানা হাবিবুর রহমান সংগঠনের নতুন কাঠামোতে যুক্ত হয়েছেন।

চট্টগ্রাম বিভাগের ফেনী জেলার আমির হিসেবে অধ্যক্ষ একেএম শামসুদ্দিন পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। কুমিল্লা সিটি আমির হিসেবে কাজী দ্বীন মোহাম্মদ, কুমিল্লা দক্ষিণে আবদুস সাত্তার, উত্তরে অধ্যাপক আশ্রাব উদ্দিন নির্বাচিত হন। চাঁদপুর জেলা আমির হিসেবে মাওলানা আবদুর রহিম, নোয়াখালীতে মাওলানা আলাউদ্দিন  ও লক্ষ্মীপুর জেলা আমির হিসেবে মাস্টার রুহুল আমীন ভুঁইয়া নির্বাচিত হয়েছেন।

ফেনী জেলা আমির একেএম শামসুদ্দিন জানান, ‘নির্বাচিত আমিররা শপথ নিয়েছেন।’

খুলনা মহানগরী কমিটির সহকারী সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট শাহ আলম বলেন, ‘বিগত দিনে যারা এখানে ছিলেন, তারাই পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন।’

হবিগঞ্জ জেলার সেট-আপ  আজ  মঙ্গলবার (১২ ফেব্রুয়ারি) করা হচ্ছে। কেন্দ্র থেকে ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন রয়েছেন ওই অঞ্চলের দায়িত্বে।

 

/এসটিএস/এপিএইচ/

x