কোন পথে ছাত্রলীগ?

মাহবুব হাসান ১৭:৪৮ , জুলাই ০৯ , ২০১৯

বাংলাদেশ ছাত্রলীগ

পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন নিয়ে ছাত্রলীগের সংকট আপাতত কেটেছে। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের হস্তক্ষেপে আন্দোলনকারীরা পিছু হটেছেন। কিন্তু একটার পর একটা জটিলতা যেন দুষ্টচক্রে আবদ্ধ করেছে সংগঠনটিকে। যথাসময়ে সম্মেলন হয় না, সম্মেলন হয় তো কমিটি হয় না, কমিটি হয় তো পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয় না, পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয় তো বিতর্ক ও অভ্যন্তরীণ আন্দোলন থামে না। এসব মিলিয়েই গত কয়েক বছর ধরে চলছে ছাত্রলীগ।

তবে এসব ঘটনাকে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ মনে করছেন সংগঠনটির শীর্ষ নেতৃত্ব এবং ছাত্রলীগের দায়িত্বে থাকা আওয়ামী লীগ নেতারাও। ছাত্রলীগকে পরামর্শ দেওয়ার দায়িত্বপ্রাপ্তদের মধ্যে অন্যতম আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, 'ছাত্রলীগ বিশাল একটি সংগঠন। ৩০১ বিশিষ্ট কমিটিতে সবাই স্থান পাবে না, এটা স্বাভাবিক। প্রতি কমিটিতেই এমন হয়ে আসছে। কিন্তু তারপরও কমিটি নিয়ে বিতর্ক তোলাটা দুঃখজনক। আর যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে, তাদের নিয়ে তদন্ত করা হয়েছে। অনেকে চিহ্নিত হয়েছেন। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত তারা কেউ ছাত্রলীগ করতে পারবেন না।’ 

অবশেষে পূর্ণাঙ্গ কমিটি

ছাত্রলীগের সাবেক কমিটির মেয়াদ পার হওয়ার পরও সম্মেলন নিয়ে টালবাহনা করছিলেন সংগঠনটির তৎকালীন শীর্ষ নেতারা। অবশেষে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটিতে বিষয়টি তোলেন দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান। ওই বৈঠকেই ছাত্রলীগের সম্মেলনের সিদ্ধান্ত হয়। এরপরই ২০১৮ সালের সম্মেলনকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগকে সিন্ডিকেটমুক্ত করতে মাঠে নামেন ছাত্রলীগের সাবেক অনেক নেতা। মূল দল আওয়ামী লীগের অনেকেই তাদের সমর্থন দেন। ওই বছরের ১১ ও ১২ মে কমিটি ঘোষণা ছাড়াই সম্মেলন শেষ হয়। আওয়ামী লীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা এমনকি দলটির সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বয়ং নানা সূত্রে খবর নিয়ে কেন্দ্রে ৩১ জুলাই রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনকে সভাপতি এবং গোলাম রাব্বানীকে সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখায় সনজিত চন্দ্রকে সভাপতি ও সাদ্দাম হোসাইনকে সাধারণ সম্পাদক করে কমিটি ঘোষণা দেন। কিন্তু একবছর পার হয়ে গেলেও ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে ব্যর্থ হন। এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দ্রুত পূর্ণাঙ্গ কমিটির ঘোষণা না দিলে কমিটি ভেঙে দেওয়ার হুঁশিয়ারি  দেন। এরপর তৎপরতা শুরু করেন সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান, জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাংগঠনিক সম্পাদক বাহাউদ্দিন নাছিম এবং বি এম মোজাম্মেল হককে ছাত্রলীগকে পরামর্শ দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়। অবশেষে এ বছরের ১৩ মে ৩০১ সদস্যবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করে ছাত্রলীগ।

পূর্ণাঙ্গ কমিটি নিয়ে বিতর্ক

কমিটি ঘোষণার পর ১০৭ জন পদধারীর বিরুদ্ধে বিবাহিত, খুনের আসামি, চাঁদাবাজি, বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং বিএনপি-জামায়াত পরিবার বা এদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করে আন্দোলনে নামে একটি অংশ। আবার আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধেও নানা অভিযোগ আসতে শুরু করে। কমিটিতে পদ পাওয়া অনেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে তাদের বাদ দেওয়া এবং নিজেদের কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে অন্তর্ভুক্তির দাবি জানিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন আন্দোলনকারীরা। এরপর মধুর ক্যান্টিন ও টিএসসিতে তাদের ওপর দুই দফায় হামলা করে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের অনুসারীরা। এ অবস্থায় চার দফা দাবিতে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বরাবর স্মারকলিপি দেন পদবঞ্চিত ও প্রত্যাশিত পদ না পাওয়া নেতারা। অপরদিকে আন্দোলনরতদের বিরুদ্ধেও অনেক অভিযোগ ওঠে। আন্দোলনকারীদের অন্যতম নেতা লাকী আক্তারের বিরুদ্ধে বিবাহিত হওয়ার অভিযোগ ওঠে। এমনকি তার কাবিননামাও বিভিন্ন গণমাধ্যমে ছাপা হয়।

২৮ মে দিবাগত রাত ১টায় সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ১৯টি পদ শূন্য ঘোষণা করা হয়।  কিন্তু তারা কারা তা স্পষ্ট হয়নি এবং সেসব পদে কাউকে পদায়নও করা হয়নি। পদবঞ্চিতদের আন্দোলন বন্ধ হলেও একটা বিশেষ মহলের ইন্ধনে এ আন্দোলন চলছিলো বলে অভিযোগ করছেন পদপ্রাপ্তরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সাংগঠনিক সম্পাদক অভিযোগ করেন, সিন্ডিকেট আন্দোলনকারীদের ইন্ধন দিচ্ছে। যারা আন্দোলন করছে তাদের বেশিরভাগই সিন্ডিকেট তথা সাবেক সভাপতি সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক জাকিরের লোক। তার অভিযোগের পক্ষে তিনি নানা যুক্তি তুলে ধরেন।

তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসেন অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ছাত্রলীগের নেতৃত্ব দিয়েছি। যারা আমাদের সঙ্গে রাজনীতি করেছেন, তাদের মধ্যে যাদের বয়স আছে, তারা এখন নতুন সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের রাজনীতি করছেন। এরা সবাই ছাত্রলীগের নেতা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার লোক। ছাত্রলীগে কোনও সিন্ডিকেট ছিল না, এখনও নেই।’

পাল্টা সিন্ডিকেট?

এদিকে ছাত্রলীগ এক সিন্ডিকেট থেকে বের হতে না হতেই আরেক সিন্ডিকেটের হাতে অনেকটাই জিম্মি বলে অভিযোগ উঠেছে। ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্ট আওয়ামী লীগের দুই জন নেতা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক শোভনকে সারাক্ষণ পর্যবেক্ষণে রাখেন ছাত্রলীগের সাবেক কয়েকজন নেতা। তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা সাবেক আরেক নেতা। জানা যায়, ছাত্রলীগের সাবেক এক সভাপতি ও সভাপতি পদের দাবিদার সাবেক এক প্রার্থী শোভনকে বিভিন্ন বিষয়ে উপদেশ-পরামর্শ দেন। এছাড়া শোভনের নিজ জেলার সাবেক এক কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতা শোভনের ওপর নানাভাবে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন।  আর সাধারণ সম্পাদক পুরনো সিন্ডিকেটের হয়েই কাজ করছেন বলে ছাত্রলীগ ও সংশ্লিষ্ট আওয়ামী লীগ নেতাদের বক্তব্য।

সার্বিক বিষয় নিয়ে ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরীর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অভিযুক্ত অনেককে নিয়ে তদন্ত করা হয়েছে। এটি চলমান প্রক্রিয়া। যাদের বিরুদ্ধে প্রমাণ পাওয়া গেছে, দ্রুতই তাদের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আর যারা আন্দোলন করছেন, তারা বিপথগামী একটি মহলের ইন্ধনে করছেন। ছাত্রলীগের অভিভাবক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় সংগঠনটিকে শক্তিশালী ও গঠনমূলক করে গড়ে তোলা হচ্ছে। ছাত্রলীগ যেমন অন্যায় দাবির কাছে মাথানত করবে না, তেমনি অপরাধী বা যারা ছাত্রলীগ করার যোগ্য নয় তারাও এখানে পদ পাবে না।’ তাকে ঘিরে আরেকটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠছে-এমন অভিযোগের জবাবে তিনি বলেন, ‘সিনিয়রদের পরামর্শ নিয়েই আমরা সংগঠন পরিচালনা করি। সেটা নিশ্চয়ই সিন্ডিকেট হয়ে যায় না।’

সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর কাছে সিন্ডিকেট সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি তা অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘ছাত্রলীগ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় চলে। তার হয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় চার নেতা পরামর্শ দিচ্ছেন। এছাড়াও প্রয়োজনে বিভিন্ন ইস্যুতে সাবেক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা হয়। এছাড়া যেকোনও বিষয়েই সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের আলোচনা সাপেক্ষে সিদ্ধান্ত হয়। সবার সহযোগিতায় ছাত্রলীগ একটি আদর্শ ছাত্র সংগঠন হিসেবে কাজ করছে। কাজেই এখানে কোনও সিন্ডিকেটের প্রশ্ন অবান্তর।’

সভাপতি রেজওয়ানুল হক শোভনের সঙ্গে দূরত্বের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, দু’জনে মিলেমিশে এই সংগঠনে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন।

সিন্ডিকেট

২০০৬ সালে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সিদ্ধান্ত দেন ‘ছাত্রলীগ করবে ছাত্ররাই’। ২৭ বছরের ঊর্ধ্বে কেউ ছাত্রলীগ করতে পারবে না বলে জানিয়ে দেন তিনি। পাশাপাশি স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সে ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক পদে ভোটের নির্দেশ দেন। দেশে-বিদেশে তার এই সিদ্ধান্ত ব্যাপক প্রশংসা পেলেও ছাত্রলীগের একটি অংশ এটাকে পুঁজি করে। কাউন্সিলর বানানো, নির্বাচন কমিশন নিয়ন্ত্রণ করে অখ্যাত দুই জনকে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক পদে ভোটে পাস করিয়ে আনেন সাবেক কয়েকজন নেতা মিলে। এর মাধ্যমে তখন সাবেক নেতাদের সমন্বয়ে জন্ম নেয় ‘সিন্ডিকেট’। সে সময় বয়সের কারণে এবং ক্ষেত্রবিশেষে সিন্ডিকেটের অপছন্দের কারণে শীর্ষ দুই পদে যেতে পারেননি অনেক যোগ্য নেতা। তাছাড়া বয়সের সীমারেখা নির্দিষ্ট করায় কেন্দ্রীয় কমিটিতে আসতে অসমর্থ হন অনেক যোগ্য নেতা। অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকায় শীর্ষ নেতা হওয়ার প্রথম থেকেই সংকটে পড়ে ওই কমিটি। চারদিক থেকেই অভিযোগ উঠতে থাকে সিন্ডিকেটের ইচ্ছের বিরুদ্ধে কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক। এই সংকট ঘনীভূত হয় আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর। একের পর এক ঘটনায় সমালোচিত হতে থাকে ছাত্রলীগ। জড়িয়ে পড়ে নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে। পরবর্তীতে ২০১১ এবং ২০১৫ সালে ছাত্রলীগের আরও দুটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু দু’বারই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়। সিন্ডিকেট তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোটে জিতিয়ে আনে বলে অভিযোগ ছিল।

ছাত্রলীগের সার্বিক কর্মকাণ্ড নিয়ে জানতে চাইলে এর দেখভালের অন্যতম দায়িত্ব পালনকারী আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদিন নাছিম বলেন, ‘ছাত্রলীগ দেশের ঐতিহ্যবাহী ছাত্র সংগঠন। রাজনীতির পথচলায় সংগঠনটিকে নানা চড়াই-উৎড়াই পার করতে হয়েছে। দেশ গঠনের প্রতিটি সোপানে রয়েছে এর গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। ছাত্রলীগের যেমন ভালো ভালো অনেক কাজ রয়েছে, তেমনি দু’একটি ঘটনায় সমালোচনাও আছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের চার নেতাকে দায়িত্ব দেওয়ার পর সম্প্রতি সময়ে সংগঠনটির পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়েছে। আমরা আত্ববিশ্বাসী একটি শক্তিশালী, আদর্শ ও শিক্ষার্থীদের কল্যাণকর সংগঠন হিসেবে ছাত্রলীগ কাজ করে যাবে।’

 

/এফএস/টিএন/

x