এরশাদকে ছেড়ে গেছেন ঘনিষ্ঠরা

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট ১১:৫৩ , জুলাই ১৪ , ২০১৯

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ১৯৮২ সালে ক্ষমতায় বসার চার বছর পর জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি জাতীয় ফ্রন্টের ধানমন্ডির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে ‘জাতীয় পার্টি’ (জাপা) গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়। পাঁচটি শরিক দল এক হয়ে এর আত্মপ্রকাশ ঘটে। এর চার বছর পর ’৯০ সালে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন এরশাদ। এর মধ্য দিয়ে অবসান ঘটে ‘এরশাদ যুগে’র।

তবে ’৯১ সালে দেশে আবারও সংসদীয় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা চালু হওয়ার পর রাজনীতিতে গুরুত্ব বাড়তে থাকে তার। বৃহৎ দুটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ভোটের রাজনৈতিক সমীকরণে জড়িয়ে যান তিনি। অবশ্য এই জোট-রাজনীতিতে সাবেক এই রাষ্ট্রপতি হারিয়েছেন দলের অনেক জ্যেষ্ঠ নেতাকে, নিজের একসময়ের ঘনিষ্ঠ সহকর্মীদের। যাদের মন্ত্রী বানিয়েছিলেন, তাদের অনেকেই ‘সুযোগ-সুবিধা’র প্রশ্নে পক্ষ ত্যাগ করেছেন।

জাতীয় পার্টির নেতাদের দল পরিবর্তনের প্রসঙ্গে এরশাদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মুহাম্মদ ইসহাক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, কেএম ওবায়দুর রহমান, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনসহ অনেকেই এরশাদ সাহেবকে ত্যাগ করে অন্য দলে ভিড়েছেন।’

প্রবীণ এই রাজনীতিক বলেন, ‘তবে যারা দল ত্যাগ করেছেন, তাদের বেশিরভাগই বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। অনেকে জিয়াউর রহমানের হাত ধরে বিএনপিতে ছিলেন, পরে ক্ষমতা পরিবর্তনের কারণে জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়েছিলেন।’

দল পরিবর্তন ঘটে সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য মন্তব্য করে মাওলানা ইসহাক বলেন, ‘আমাকে এরশাদ সাহেব অনেকবার বলেছেন, কিন্তু আমি যাইনি।’ তার দাবি, সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য তিনি রাজনীতি করেন না।

তথ্যানুসন্ধানে দেখা গেছে, ১৯৮৮ সালে এরশাদ সরকারের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। তিনি শিল্প মন্ত্রণালয়ও দেখভাল করেছেন। এখন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য তিনি। ২০০১ সালে জোট সরকারে আইনমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।

জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাকালীন মহাসচিব প্রফেসর এমএ মতিন বিএনপি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। এরশাদ সরকারের উপপ্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমেদ পরে নতুন জাতীয় পার্টি গঠন করেন। তবে তিনি অন্য কোনও দলে যোগ দেননি।

মওদুদ আহমদ

’৮৮ সালে এরশাদ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন। বর্তমানে তিনি বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান।

জেপি’র আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ছিলেন এরশাদ সরকারের যোগাযোগমন্ত্রী। বর্তমানে তিনি মহাজোটে আছেন। গত আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় মেয়াদে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য ছিলেন।

১৯৮৬ সালে নবগঠিত জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। মহাসচিব নিযুক্ত হন অধ্যাপক এমএ মতিন। ৬০১ সদস্যের জাতীয় কমিটি গঠিত হয়। ৫৭ সদস্যের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য সচিব হন সাংবাদিক আনোয়ার জাহিদ। পরে তিনি ১৯৯৯ সালে ৪ দলীয় জোট গঠনে ভূমিকা রাখেন এবং বিএনপিতে সক্রিয় হন।

এরশাদ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। আওয়ামী লীগ ’৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে তাকে স্পিকার নির্বাচিত করে।

জাপার দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, প্রতিষ্ঠাকালে ফ্রন্টের শরিক দল জনদল, ইউপিপি, গণতান্ত্রিক পার্টি, বিএনপি (শাহ) এবং মুসলিম লীগ (সা) নিজেদের অস্তিত্ব বিলুপ্ত ঘোষণা করে জাতীয় পার্টিতে একীভূত হয়। পরে ১৯৮৫ সালের ১৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতি এরশাদের নীতি ও আদর্শ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার নিয়ে জাতীয় ফ্রন্ট গঠিত হয়। রাজনৈতিক দলের বাইরেও অনেক বরেণ্য ব্যক্তিত্ব ও নেতা এই ফ্রন্টে যোগ দিয়েছিলেন। পার্টি গঠনের ঘোষণার দিনে তারাও জাতীয় পার্টিতে যোগ করেন।

জাতীয় পার্টি গঠনের দিন ২১ সদস্যের প্রেসিডিয়াম, ৫৭ সদস্যের জাতীয় নির্বাহী কমিটিসহ ৬০১ সদস্যের জাতীয় নির্বাহী কমিটির ঘোষণা দেওয়া হয়। ২১ সদস্যের প্রেসিডিয়ামের মধ্যে ১৮ জনের নাম ঘোষণা করা হয়। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মিজানুর রহমান চৌধুরী (আসেন আওয়ামী লীগ থেকে), মওদুদ আহমদ (আসেন বিএনপি থেকে, পরে আবার জাপা ছেড়ে বিএনপি), কাজী জাফর আহমেদ (পৃথক দল), সিরাজুল হোসেন খান, রিয়াজউদ্দিন আহমেদ ভোলা মিয়া, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী (বিএনপিতে যোগ দেন), আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ও হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী।

এরশাদ সরকারের ধর্ম প্রতিমন্ত্রী ছিলেন মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাছ। বর্তমানে তিনি জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের (একাংশ) চেয়ারম্যান। দল পরিবর্তনের বিষয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘অন্যরা কেন দল ত্যাগ করেছে সেই বিষয়ে তো আমি সঠিক বলতে পারবো না। ১৯৮৬ থেকে ’৯০ সাল পর্যন্ত আমি এরশাদের সঙ্গে ছিলাম। আমি স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে জয়ী হওয়ার পরে জাতীয় পার্টিতে যোগদান করি। কিন্তু আমার মূল দল ছিল জমিয়তে ইসলাম। পরে আমি আবার সেই দলে ফিরে আসি। এরশাদ সাহেব আমাকে যথেষ্ট ভালো জানতেন।’

জাতীয় পার্টিতে যোগদান করার দিনে এরশাদ তাকে ২ লাখ টাকা দিতে চেয়েছিলেন বলে দাবি করেন মুফতি ওয়াক্কাছ। তিনি বলেন, ‘কিন্তু আমি বলেছি টাকা নেবো না। আমরা এলাকার উন্নয়ন দরকার। ফলে যোগদানের দিন আমি ২ লাখ টাকা নিইনি।’ ব্যক্তিগতভাবে এরশাদের অনেক কিছু থাকলেও বাংলাদেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রে তার অনেক অবদান আছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

আরও পড়ুন:

 

এরশাদের মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রীর শোক

সামরিক শাসক থেকে রাজনীতিক

 

/এএইচআর/এসটিএস/এইচআই/এমএমজে/

x