বিদায় নিচ্ছেন মকবুল, জামায়াতের নতুন আমির হচ্ছেন কে

সালমান তারেক শাকিল ২৩:৩৯ , অক্টোবর ০৮ , ২০১৯





নয় বছরের বেশি সময় জামায়াতে ইসলামীর আমির হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর অবসরে যাচ্ছেন মকবুল আহমাদ। গত মাসে অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে দলের নির্বাহী পরিষদে অবসরের চিঠি দেন তিনি। পরিষদে তা গৃহীতও হয়েছে। জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের একাধিক দায়িত্বশীল ব্যক্তি এই তথ্য জানিয়েছেন।
মকবুল আহমাদ ২০১০ সালের ২৯ জুন থেকে ২০১৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত আমির ছিলেন, ২০১৭ সাল থেকে নির্বাচিত আমিরের দায়িত্বে আছেন। আগামী ডিসেম্বরে তার মেয়াদ শেষ হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, গঠনতন্ত্র সংশোধন (২২তম সংশোধনী) করে আগের পদ্ধতিতেই নতুন আমির নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে জামায়াত। চলতি সপ্তাহেই ভোটগ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আগামী ১৫ অক্টোবরের মধ্যে কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার সদস্যরা গোপন ব্যালটে প্রথমে ‘৩ জনের প্যানেল আমির’ (আমির নির্বাচনের প্রার্থী) নির্বাচন করবেন। এরপর ৩ জনের প্যানেল থেকে আমির হিসেবে নির্বাচিত করতে গোপন ব্যালটে ভোট দেবেন সারাদেশের রুকনরা। তবে প্যানেলের বাইরে থেকে যেকোনও রুকনকেও আমির হিসেবে ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকছে। মকবুল আহমাদের অবসরে যাওয়ার বিষয়টি সারাদেশের শুরা সদস্যদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
জামায়াতের নির্বাহী পরিষদের সদস্য দলের অন্যতম নায়েবে আমির অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তিন বছর পর পর আমাদের আমির নির্বাচন হয়। এবারও যথাসময়ে তাই হবে, এর কোনও ব্যত্যয় ঘটবে না। অক্টোবর থেকে নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ভোটগ্রহণ, ফল ঘোষণা, নতুন আমিরের শপথগ্রহণসহ সার্বিক কাজ ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হবে। আমিরের কার্যকাল শুরু হবে সামনের জানুয়ারি থেকে।’
কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার সদস্য, ফেনী জেলা জামায়াতের আমির একেএম শামসুদ্দিন বলেন, ‘এ সপ্তাহে প্যানেল আমির নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এরপর আমির নির্বাচন শুরু হবে। সব রুকনের কাছ থেকে মতামত নিয়ে পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে আরও কিছুদিন সময় লাগবে।’
জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সূত্র জানায়, আমির নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ‘কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন’ হিসেবে কাজ করছেন ৪ সদস্যের একটি টিম। সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবু তাহের মাছুমের নেতৃত্বে টিমের বাকিরা হলেন জোনাল ইনচার্জ আবদুর রব, অফিস সহকারী আবদুস সাত্তার ও বায়তুল মাল সম্পাদক শাহাবুদ্দীন।
বিদায় নিচ্ছেন মকবুল
গত সেপ্টেম্বরে দলের নির্বাহী পরিষদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়ে রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়ার কথা জানান মকবুল আহমাদ। স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে তিনি পরিষদকে অনুরোধ করেন ভবিষ্যতের নেতৃত্বে তাকে যেন না রাখা হয়। নির্বাহী পরিষদ তা মেনে নেয়। পরিষদের একাধিক সদস্য এ তথ্য জানান।
মানবতাবিরোধী অপরাধে যুক্ত থাকার দায়ে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের অনুপস্থিতিতে ২০১০ সালে দলের শীর্ষ নেতৃত্বে আসেন মকবুল আহমাদ। আগামী ডিসেম্বরে তার মেয়াদকাল ৯ বছর ৫ মাস ছাড়িয়ে যাবে।
জামায়াতের আমির হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধের সময় বিরোধিতার অভিযোগ ওঠে মকবুল আহমাদের বিরুদ্ধে। বাংলা ট্রিবিউনে এ বিষয়ে ‘জামায়াতের নতুন আমির: ৭১-এর রাজাকার-কমান্ডার, আছে হত্যার অভিযোগও’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশের জেরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা তদন্ত শুরু করে। বর্তমানে সাক্ষী সংকটে আছে এই তদন্ত কার্যক্রম

দলের শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি দেওয়াকে কেন্দ্র করে ২০১৩-১৪ সালে দেশব্যাপী নাশকতার সময় দলের নেতৃত্বে থাকলেও মকবুল আহমাদের হাত ধরেই ‘রাজনৈতিকভাবে’ নিষ্ক্রিয় হতে শুরু করে জামায়াত। দলের চারটি স্থায়ী কর্মসূচি থেকে চার নম্বর উপধারাটি (‘গণতান্ত্রিক পন্থায় সরকার পরিবর্তন এবং সমাজের সর্বস্তরে সৎ ও চরিত্রবান লোকের নেতৃত্ব কায়েমের চেষ্টা করা’) স্থগিত করা হয়েছে। ২০১৭ সালে নির্বাচিত আমির হওয়ার পর মকবুল আহমাদ স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল আতাউল গনি ওসমানীসহ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতাদের স্মরণ করেন।
মকবুল আহমাদদলীয় সূত্রে জানা গেছে, মকবুল আহমাদ জামায়াতের তৃতীয় নির্বাচিত আমির। এর আগে গোলাম আযম ও মতিউর রহমান নিজামী দলটির নির্বাচিত আমির ছিলেন। এর বাইরে বিভিন্ন সময় প্রয়াত আব্বাস আলী খান, মাওলানা আবদুর রহিম দলটির ভারপ্রাপ্ত আমিরের দায়িত্বে পালন করেন। তৃতীয় ভারপ্রাপ্ত আমির হিসেবেও মকবুল আহমাদ দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেছেন।
জামায়াতের প্রচার বিভাগ থেকে জানা গেছে, মকবুল আহমাদ ১৯৮৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেন। তিনি জামায়াতের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল, নায়েবে আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সর্বশেষ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেননি মকবুল আহমাদ।
মকবুল আহমাদের প্রসঙ্গে জামায়াতের রাজনীতির ঘনিষ্ঠ পর্যবেক্ষক সাবেক সচিব শাহ আবদুল হান্নান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মকবুল আহমাদ একজন সৎ ও যোগ্য লোক। দলের অখণ্ডতায় তিনিসহ দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের ভূমিকা অনেক। যারা দল ভাঙতে চেয়েছিল, তারা নেই। তিনি দলের উপদেষ্টা হিসেবে থাকবেন সাবেক আমির গোলাম আযমের মতো।’
আবারও গঠনতন্ত্র সংশোধন
জামায়াতের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা জানান, ২০১৭ সালে সংশোধিত সর্বশেষ গঠনতন্ত্রে রুকন সম্মেলনের পরিবর্তে ‘জাতীয় কাউন্সিল’ নির্ধারণ করা হয়। এ বছর তা আবার পাল্টে পুরনো ধারাতেই আমির নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু করে জামায়াত। এ নিয়ে ২২তম সংশোধনী আনা হলো দলের গঠনতন্ত্রে।
দলের নির্বাহী পরিষদের এক সদস্য বলেন, ‘শারীরিক অসুস্থতার কারণে নির্বাচনি প্রসেস থেকে অব্যাহতি চেয়েছেন মকবুল আহমাদ। তিনি অবসরে যাবেন, এ সিদ্ধান্তের পরই আমির নির্বাচন প্রক্রিয়ায় আমরা ভেবেছি সব রুকনের ভূমিকা থাকবে। সে কারণে নির্বাহী পরিষদ গঠনতন্ত্র সংশোধনের প্রস্তাব পাস করে এবং শুরা সদস্যদের কাছ থেকে তা গৃহীত হয়। এখন পুরনো সিস্টেমে শুরা সদস্যরা প্যানেল নির্বাচন করবেন এবং সেখান থেকে রুকনরা একজনকে আমির নির্বাচনের জন্য ভোট দেবেন।’
এ বিষয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘সংগঠনের একটি গঠনতন্ত্র আছে। গঠনতন্ত্র মোতাবেক কাজ হবে। বিস্তারিত কথাবার্তা আমাদের সেক্রেটারি জেনারেল বলবেন। গঠনতন্ত্রের নির্দিষ্ট মেয়াদেই কার্যক্রম চলবে।’
পরবর্তী আমির কে
জামায়াতের বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলে জানা গেছে, আমির নির্বাচনের ক্ষেত্রে সিনিয়রিটি (জ্যেষ্ঠতা) একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জামায়াতে। অতীতেও পদবির সিনিয়রিটি হিসেবেই আমির নির্বাচন করা হয়েছে। বর্তমানে দলের ৫ জন নায়েবে আমির আছেন। তারা হলেন অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, মাওলানা আবদুস সুবহান (জেলে আছেন), মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী (সাজাপ্রাপ্ত), মিয়া গোলাম পরওয়ার, আ ন ম শামসুল ইসলাম।
দলের একাধিক সূত্রের দাবি, আমির হিসেবে আলোচনায় আছেন বর্তমান সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান। ইন্টারনালি ক্যাম্পেনিংয়ে যুক্ত আছেন তিনি, এমন দাবিও আছে কোনও কোনও নেতার। এ বিষয়ে জামায়াতের কূটনৈতিক কোরের গুরুত্বপূর্ণ নেতা বলেন, জামায়াতের মতো দলে এ ধরনের চর্চার কোনও সুযোগ নেই। এটা অবিশ্বাস্য। জামায়াত একটি গঠনতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক দল।
জামায়াতের মজলিসে শুরার একজন সদস্য মনে করেন, নায়েবে আমিরদের মধ্য থেকেই আমির নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। মুজিবুর রহমান, মিয়া গোলাম পরওয়ারের নাম ঘুরে-ফিরে আসছে।
কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য, সিলেট মহানগর জামায়াতের আমির অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘আমির নির্বাচনের আগে প্যানেল নির্বাচন হবে। এরপর হবে আমির নির্বাচন। আর এটা আমাদের অত্যন্ত গোপন প্রক্রিয়া। রুকনরা ভোট দিয়ে নেতৃত্ব নির্বাচন করবেন।’
বন্ধ নতুন নামকরণের প্রক্রিয়া
গত ১৫ ফেব্রুয়ারি দলের নেতাকর্মীদের চিঠি দিয়ে জানানো হয়, শুরা সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতে জামায়াতের নতুন নামকরণের বিষয়ে ৫ সদস্যের একটি কমিটি করা হয়।
গত আগস্টে কমিটির প্রধান সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান এ প্রতিবেদককে এ কার্যক্রমে কিছু অগ্রগতির কথা বলেছিলেন। যদিও বর্তমানে তা অনেকটাই থেমে আছে।
সম্প্রতি কমিটির আরেক সদস্য বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ওই কার্যক্রম আপাতত বন্ধ আছে। নতুন আমির নির্বাচনের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে।’
জানতে চাইলে কমিটির সদস্য নায়েবে আমির মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, এসব বিষয়ে দায়িত্বশীলরা বলবেন। তার কিছু বলার নেই।

/এইচআই/এমএমজে/

x