ভারতের এ বিশাল হার হয়েছে ভিন্নমাত্রায় উপভোগ্য

গাজী আশরাফ হোসেন লিপু ১৮:১১ , জুন ১৯ , ২০১৭

.চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ফাইনালে পাকিস্তানের পৌঁছানো ছিল একটা বড় চমক। কাল (রবিবার) ফাইনালে এই টুর্নামেন্টের অন্যতম ফেভারিটকে এত বিশাল ব্যবধানে ও একতরফাভাবে হারানোটা পাকিস্তানের ক্রিকেট ইতিহাসের গত এক যুগের অন্যতম সেরা ঘটনা।

রান তাড়া করতে ভারত ভালো পারে এবং এ বিষয়ে ব্যক্তিগতভাবে অনেক সফল বলেই কি টস জিতে আগে বল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বিরাট কোহলি? ইতোপূর্বে রেকর্ডের আলোকে হয়তো এটা সত্যি। তারপরও দুটি বিষয় তাকে প্রভাবিত করে থাকতে পারে- শ্রীলঙ্কার সঙ্গে ৩২১ রান করেও তার দলের বোলাররা সেটা প্রতিহত করতে পারেনি এবং পাকিস্তানের দুর্দান্ত পেস বোলারদের সকালে উইকেটের বাড়তি সাহায্য কাজে লাগানোর সুযোগ কোনোভাবেই দেওয়া যাবে না।

কাল দুই দলের ভাগ্য দুই মেরুতে অবস্থান করছিল। নিজেদের প্রতি অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস ছিল ভারতের পতনের অন্যতম কারণ, পক্ষান্তরে প্রাপ্ত সুযোগ ও জয়ের জন্য লড়াই করার দলগত প্রচেষ্টাই ছিল পাকিস্তানের মূল শক্তি। ভারত এই টুর্নামেন্টের বিভিন্ন ম্যাচে অনেকগুলো রান আউট পেলেও গতকাল প্রয়োজনের দিনে নিশ্চিতভাবে তিনটি সুযোগ হারিয়েছে। নিজেদের বোলিং মেধার দিকে যত্নশীল না হয়ে ফখর জামানের দুর্বল জায়গায় অর্থাৎ পায়ের লাইনে বল করতে গিয়ে প্রচুর ওয়াইড বল করেছে। ফাইনালে তিনটি নো বল এক কথায় অবিশ্বাস্য ব্যাপার। সকাল বা বিকাল কোনও অর্ধেই ভাগ্যদেবীর সাক্ষাৎ ভারতের সঙ্গে ছিল না।

একমাত্র ভুবনেশ্বর কুমার বাদে কোনও বোলারই উজ্জ্বল ছিলেন না। জাদেজার বোলিংয়ের অফফর্ম ও অশ্বিনের দীর্ঘ বিরতির পর স্বরূপে ফিরে আসতে না পারায় পাকিস্তানের ব্যাটিংয়ের পার্টনারশীপ ভাঙা বা রান নিয়ন্ত্রণ কোনোটাতেই তারা কাজে আসেনি। উপরে আজহার আলী ও ফখর জামানের দারুণ সূচনা ও শেষ অংশে অনেক দিন পর মোহাম্মদ হাফিজের অসাধারণ ফিনিশিংয়ের কল্যাণে ৩৩৮ রানের এক পাহাড় টপকানোর দুশ্চিন্তা নিয়ে ভারত লাঞ্চ করতে যায়।

পেস বোলিং ছিল পাকিস্তান দলের মূল শক্তি। তবে দলের এত ভালো ব্যাটিংয়ের পর দুই প্রান্ত থেকে নতুন শক্ত বলের উজ্জ্বলতাকে কাজে লাগিয়ে এত নিখুঁত লাইনে এত প্রাণবন্ত বোলিং ফাইনালের মতো হাই ভোল্টেজ ম্যাচে বহুদিন দেখিনি। মোহাম্মদ আমির মূল আঘাতটা হেনেছেন। তবে অন্য প্রান্ত থেকে জুনাইদ উইকেট না পেলেও ব্যাটসম্যানদের উপর সমানভাবে চাপ সৃষ্টি অব্যাহত রেখেছিলেন। শুরুতেই একটি বলে পরাস্ত হওয়া এবং তার পরপরই স্লিপে ক্যাচ দিয়ে জীবন পাওয়া কোহলির আত্মবিশ্বাসের চেয়ে আত্মমর্যাদায় বড় ধরনের আঘাত হেনেছিল বলে আমার মনে হয়। পরের বলে তার প্রস্থানে শঙ্কিত হয়েছে ড্রেসিংরুম।

সঙ্কটের মুহূর্তে মহেন্দ্র সিং ধোনির সম্পদের ভাণ্ডার তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল কি না সে প্রশ্ন উঠতে পারে এখন। তিন উইকেট পতনের পর ম্যাচে ফেরার জন্য আর কোনও পার্টনারশিপ ভারত গড়তে পারবে না এটা অবিশ্বাস্যভাবে সারা পৃথিবী দেখল।

এই টুর্নামেন্টে অনেক ব্যাটসম্যান বা বোলারকে আম্পায়ারের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে রিভিউ নিয়ে অনেককেই ব্যর্থ হতে দেখা গেছে। তরুণ শাদাব খান ছিলেন সেক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। যুবরাজ সিংয়ের এলবিডব্লিউর সুযোগ সৃষ্টির ব্যাপারে তিনি অসাধারণ বলই শুধু করেননি, তার চেয়ে বেশি আত্মবিশ্বাস নিয়ে আইসিসির সর্বোচ্চ প্যানেলের আম্পায়ারের বিচক্ষণ সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। তার প্রতি আস্থা রাখতে রিভিউ নিতে অধিনায়ককে রাজি করেছেন এবং বিপজ্জনক যুবরাজকে প্যাভিলিয়নে পাঠান।

মোহাম্মদ আমিরের নতুন বলের ধারালো বোলিংয়ের পর নিয়মিত রুটিনের মতো হাসান আলী তার দায়িত্ব পালন করায় বিষয়টি দাঁড়ায়, কত বড় ব্যবধানে ভারত হারতে যাচ্ছে।

নতুন জীবন পেয়ে নিজের ব্যাটিং সাফল্যের ধারাবাহিকতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করলেন ফখর জামান এবং ঠিক একইভাবে তেমনই একটি সুযোগের অপব্যবহার যখন কোহলি করলেন, তখনই ভারতের গ্যাস বেলুন ফুটো হয়ে যায়।

সাম্প্রতিককালে ক্রিকেট বাণিজ্যের পাহাড়ের চূড়ায় বসা ভারতীয় বোর্ডের আচরণ, দাম্ভিকতা ও তাদের পারফরম্যান্সের বাহাদুরি হজম করা সবার জন্য বেশ পীড়াদায়ক হয়ে যাচ্ছিল। কাল এত বড় মাপের টুর্নামেন্ট শেষে সব চাকচিক্য তাদের পিছু না ছাড়লেও যেটা নিয়ে তাদের দাম্ভিকতা সেই কাপটি অন্য কেউ নয়, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান নিয়ে গেল তাদের চোখের সামনেই। বিগ থ্রির অন্যতম রূপকার ভারতের এই বিশাল পরাজয় বাকি ক্রিকেট বিশ্ব ভিন্নমাত্রায় উপভোগ করেছে।

/এফএইচএম/

x