নেইমারে স্বপ্ন, নেইমারে মুক্তি

খালিদ রাজ ১০:০৩ , জুন ১৪ , ২০১৮

নেইমার
৭-১। সংখ্যাটা দেখলে ব্রাজিলিয়ানরা হয়তো এখনও কেঁপে ওঠেন। এটা তো শুধু সংখ্যা নয়, তাদের কাছে স্বপ্নভঙ্গ, সীমাহীন যন্ত্রণা ও লজ্জার ‘টাইমলাইন’। জার্মানি বিপক্ষে ঘরের মাঠের বিশ্বকাপে ব্রাজিলের অসহায় আত্মসমর্পণের দৃশ্য হাসপাতালের বিছানায় যন্ত্রণায় কাতরে দেখেছিলেন নেইমার। যাকে ঘিরে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জিতে ইতিহাসের দায় শোধ করতে চেয়েছিলেন ব্রাজিলিয়ানরা, তিনি নিজেই ট্র্যাজেডির শিকার!

কলম্বিয়ার বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে চোটে পড়ে বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যায় তার। দলের সেরা অস্ত্রকে হারিয়ে এলোমেলো ব্রাজিল বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে বড় লজ্জার শিকার হয় ৭-১ গোলে বিধ্বস্ত হয়ে। লজ্জার সাগরে ডুবে যাওয়া সেলেসাওদের আবার টেনে তুলেছেন এই নেইমারই। তার পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস সঙ্গী করে ঘুরে দাঁড়িয়েছে ব্রাজিল। আর সেটা এতটা দাপট দেখিয়ে যে সবার আগে রাশিয়া বিশ্বকাপের মূল পর্ব নিশ্চিত করে পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা।

প্রশ্নাতীতভাবে, এবারও ব্রাজিলের স্বপ্নের নায়ক নেইমার। প্যারিস সেন্ত জার্মেই ফরোয়ার্ডেই বুনেছিল তারা নতুন স্বপ্ন। কিন্তু সেখানে লাগে বিশাল ধাক্কা! রাশিয়ার প্রতিযোগিতা শুরুর প্রস্তুতির মাঝে অ্যাঙ্কেলের চোটে মাঠের বাইরে ছিটকে যান এই ফরোয়ার্ড। ফরাসি লিগ ওয়ানে অলিম্পিক মার্শেইয়ের বিপক্ষে পাওয়া চোট এতটা গুরুতর ছিল, ছুরি-কাচির নিচে যেতে হয় নেইমারকে। বিশ্বকাপে খেলতে পারবেন কিনা, এই সংশয়ও জন্মে প্রবলভাবে।

যদিও শঙ্কার মেঘ উড়িয়ে দিয়ে ফুটবল মহাযজ্ঞের আগমুহূর্তে ফিরেছেন তিনি শতভাগ ফিট হয়ে। নেইমার যে বিশ্বকাপের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত, তার প্রমাণ মিলেছে ক্রোয়েশিয়া ও অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে। চমৎকার পারফরম্যান্সে দুই ম্যাচেই লক্ষ্যভেদ করেছেন সাবেক বার্সেলোনা ফরোয়ার্ড। যাতে অনেকটা সময় মাঠের বাইরে থাকায় নেইমারের পারফরম্যান্স নিয়ে জন্মানো সংশয়ও মিলে গেছে দূর দিগন্তে।

২০১৪ সালে ঘরের মাঠের বিশ্বকাপের শেষ দৃশ্যটা হতাশার হলেও নেইমার শুরুটা করেছিলেন কিন্তু ব্রাজিলের স্বপ্নপূরণের নায়কের মতো করেই। ফুটবল মহাযজ্ঞের প্রথম তিন ম্যাচে ৪ গোল করে নকআউট পর্বে তুলেছিলেন সেলেসাওদের। চোট ও মিনেইরো ট্র্যাজেডিতে সব আশা শেষ হয়ে যাওয়া সাম্বার দেশের মানুষই রাশিয়ায় ‘হেক্সা’ জেতার স্বপ্নে বিভোর। চোট কাটিয়ে নেইমারের ফেরাটা তাদের আরও বেশি আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে।

লিওনেল মেসি ও ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর সঙ্গে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয় এখন নেইমারের নাম। ট্রান্সফার মার্কেটে তিনি ‘হটকেক’। গত গ্রীষ্মের দলবদলে বার্সেলোনা ছেড়ে রেকর্ড ২২২ মিলিয়ন ইউরোতে ব্রাজিলিয়ান তারকা নাম লিখিয়েছেন পিএসজিতে। এক বছর না হতেই আবার শোনা যাচ্ছে প্যারিস ছেড়ে রিয়াল মাদ্রিদে যাচ্ছেন তিনি। নেইমারকে পেতে মাদ্রিদের ক্লাবটি নাকি ৩৫০ মিলিয়ন ইউরো খরচ করতেও রাজি। ইউরোপে যে খেলোয়াড়কে নিয়ে ইউরোর ঝনঝনানি বাজাচ্ছে ক্লাবগুলো, তাকে ঘিরে ব্রাজিলের স্বপ্ন দেখাটা মোটেও বাড়াবাড়ি নয়।

ড্রিবলিং, গতি ও দুর্দান্ত শুটিংয়ে প্রতিপক্ষদের ঘায়েল করতে জুড়ি নেই নেইমারের। নিজে যেমন গোল করেন, তেমনি সতীর্থদের জন্যও তৈরি করেন গোলের সুযোগ। বিশ্বকাপে ব্রাজিলের এগিয়ে যাওয়ার পথটা লম্বা হবে তার পারফরম্যান্সের ওপরই। যেমনটা দেখা গেছে বিশ্বকাপ বাছাইয়ে। লাতিন আমেরিকা অঞ্চলের বাছাইয়ে খেলা ১৪ ম্যাচে করেছেন তিনি ৬ গোল। প্রয়োজনের সময় দলের জন্য গোল করে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট এনে দেওয়ায় সবার আগে বিশ্বকাপের টিকিট পায় ব্রাজিল।

২০১৪ বিশ্বকাপে নেমেছিলেন অনভিজ্ঞ ও তরুণ নেইমার। এবার তিনি আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিণত ও অভিজ্ঞ। আগের চেয়ে দায়িত্ব যেমন বেড়েছে, তেমনি প্রত্যাশার চাপও বেশি। প্রতিপক্ষের চেয়ে এই জায়গাতেই নেইমারের বড় পরীক্ষা।

ব্রাজিলের ‘হেক্সা’ মিশন পূরণ করতে এই পরীক্ষা উতরাতেই হবে নেইমারকে।

ব্রাজিলের জার্সিতে:

ম্যাচ: ৮৫

গোল: ৫৫

বিশ্বকাপ ম্যাচ: ৫

বিশ্বকাপ গোল: ৪

/কেআর/চেক-এমওএফ/

x