সিএনজিচালক বাবার অনুপ্রেরণায় আজকের বিপ্লব

রবিউল ইসলাম, চট্টগ্রাম থেকে ২০:১৪ , সেপ্টেম্বর ১৯ , ২০১৯

বাবা আব্দুল কুদ্দুস (ডানে) ও ভাই মুমিনুল ইসলাম বাবলুর (মাঝে) সঙ্গে আমিনুল ইসলাম বিপ্লববাবা আব্দুল কুদ্দুস পেশায় সিএনজি অটোরিকশাচালক। নিজে কষ্ট করলেও ছেলেকে বড় ক্রিকেটার হিসেবে গড়ে তুলতে সাধ্যের সবকিছুই করেছেন তিনি। কষ্ট বৃথা যায়নি আব্দুল কুদ্দুসের। স্বপ্নের এক একটা সিঁড়ি ভেঙে তার ছেলের হঠাৎই সুযোগ মিলেছে জাতীয় দলের জার্সিতে। মাত্র ১৯ বছরে বাংলাদেশের ক্রিকেটকে আলোকিত করা আমিনুল ইসলাম বিপ্লবের কথাই বলা হচ্ছে।

বুধবার জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ত্রিদেশীয় সিরিজ দিয়ে বাংলাদেশের জার্সিতে অভিষেক হওয়া এই ক্রিকেটারের ভ্রমণটা মোটেও সহজ ছিল না। তবে সব বাধাই পেরিয়ে গেছেন তিনি বাবার অনুপ্রেরণার। ক্রিকেটের সঙ্গে তার বাবা আব্দুল কুদ্দুসের কোনও যোগাযোগ না থাকলেও ছেলেকে দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করানোর প্রচণ্ড ইচ্ছা জন্মেছিল মনে। সেই আগ্রহ থেকেই ছেলের জাতীয় দলের পথ তৈরি করে গিয়েছেন তিন চাকার গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে।

শুরুটা হয়েছিল ওয়াহিদুল গনি একাডেমি দিয়ে। মোহাম্মদ আশরাফুলের কোচ তত্ত্বাবধানে ২০০৮ সালে পল্লীমা ক্রিকেট একাডেমিতে ক্রিকেট দীক্ষা নেওয়া শুরু তার। সেখান থেকে ২০১১ সালে ছেলেকে বিকেএসপিতে ভর্তি করান আব্দুল কুদ্দুস। ছেলে জাতীয় দলে খেলবে, এই স্বপ্ন নিয়ে দিনের পর দিন কষ্ট করে গেছেন তিনি। অবশষে গত বুধবার স্বপ্নটা সত্যি হয়েছে। ছেলে সাকিব-মুশফিকদের সঙ্গে একই জার্সি গায়ে জড়িয়ে ২২ গজে নেমেছেন, বিপ্লবের বাবার সে কী আনন্দ!

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের প্রথম ম্যাচেই নিজের ছাপ রেখেছেন বিপ্লব। ৪ ওভারে মাত্র ১৮ রান দিয়ে তার শিকার ২ উইকেট। স্বপ্নের মতো শুরুর পর হোটেলে ফিরেই বাবার সঙ্গে কথা বলেছেন বিপ্লব। কী কথা হয়েছিল বাবার সঙ্গে? বিপ্লব বললেন, “বাবা খুব আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘তুমি আমার স্বপ্নপূরণ করেছো। আমরা অনেক আনন্দিত। তোমার খেলা দেখে সবাই খুব খুশি। তুমি আরও এগিয়ে যাও, এই দোয়াই করি।’’

বাবার কথাগুলো শুনে বিপ্লবও নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি। চোখ বেয়ে নেমেছিল জলধারা। বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে ভাগাভাগি করলেন সেই মুহূর্তের অনুভূতি, “আমি সত্যিই ভাগ্যবান, এমন একজন বাবা পেয়েছি। যিনি অনেক কষ্ট করেছেন আমার জন্য। আমাকে প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করেন তিনি। তার জন্যই আমি এতদূর পর্যন্ত আসতে পেরেছি। আমার বাবা ক্রিকেট বেশ ভালো বোঝেন। কখনও সমস্যায় পড়লে বাবা আমাকে বোঝাতেন, পরিশ্রমের পাশাপাশি ধৈর্য ধরার কথা বলতেন। আব্বু রিয়াদ (মাহমুদউল্লাহ) ভাইয়ের খেলা খুব পছন্দ করেন। কিছু হলেই রিয়াদ ভাইয়ের উদহারণ দিতেন। বলতেন, ‘পরিশ্রম রিয়াদকে কোথায় নিয়ে গেছে। তার মতো পরিশ্রমী হতে হবে।”

বাবার স্বপ্নপূরণ করে বিপ্লব ভীষণ খুশি, ‘আমার বাবা ছোটবেলা থেকেই আমার জন্য কষ্ট করেছেন। তার স্বপ্নপূরণ করা আমার জন্য অবশ্যই কর্তব্য ছিল। এখন নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে সামনে এগিয়ে যেতে চাই। অনেক বড় ক্রিকেটার হতে চাই। আমার বাবা-মা যেন আরও খুশি হয়। হয়তো এভাবে তাদের ঋণ কিছুটা হলেও শোধ দিতে পারব।’

পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে বিপ্লব চতুর্থ। বাবা-মাকে নিয়ে তাদের সুখের সংসার। এই সংসারে আরও আনন্দ যোগ হয়েছে তার জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়া। বাবা-মা থেকে শুরু করে আত্মীয়-স্বজন সবাই দারুণ খুশি। বিপ্লবও সবাইকে খুশি করতে পেরে আনন্দিত, ‘জাতীয় দলে সুযোগ পেয়ে ভালো খেলতে পেরে দারুণ লাগছে। সবাই অভিনন্দন জানাচ্ছেন। সত্যি বলতে সবার আনন্দ দেখে আমার খুব বেশি ভালো লাগছে। এমন আনন্দে তাদের সবসময়ই রাখতে চাই।’

জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ম্যাচে হ্যামিল্টন মাসাকাদজার একটি বল এসে লাগে বিপ্লবের বাঁ হাতের তালুতে। তিনটি সেলাইও দিতে হয়েছে তালুতে। এই চোটে আফগানিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচে তার খেলা নিয়ে সংশয় জন্মেছে। বিপ্লব অবশ্য আশাবাদী শনিবারের ম্যাচের আগেই সুস্থ হয়ে ওঠার ব্যাপারে। এখানেও বাবার সমর্থন পাচ্ছেন ১৯ বছর বয়সী তরুণ। চোটে পড়া ছেলেকে শক্ত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন আব্দুল কুদ্দুস। বিপ্লবের ভাষায়, ‘বাবা সকালে খবরটা শুনেই ফোন দিয়েছিলেন। আমাকে দুশ্চিন্তা করতে নিষেধ করেছেন।’

বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে হাত ঘুরাতে পারলেও বোলিংয়ে নিয়মিত ছিলেন না বিপ্লব। যে কারণে তার লেগ স্পিনারের ভূমিকা অনেকেরই অজানা ছিল। জাতীয় দলে সুযোগ পেয়ে নিজের এই দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন। লেগ স্পিনারের শুরুটা হয়েছিল কিভাবে? বিপ্লব বললেন, ‘ক্যারিয়ারের শুরু থেকে বোলিং করতাম। মাঝে অনেকদিন গ্যাপ গিয়েছিল বোলিংয়ে। প্রিমিয়ার লিগে কাঁধের ইনজুরির কারণে বোলিং করতে পারতাম না। সেরে ওঠার পর কোচ সাইমন হেলমট আমার বোলিং নিয়ে কাজ শুরু করেন। ওয়াহিদুল গনি স্যারের সঙ্গে কাজ করেছি। এর আগে সোহেল স্যারের সঙ্গে কাজ করেছি, কিভাবে বোলিংয়ে উন্নতি করা যায়। ওয়াহিদ স্যার ও সোহেল স্যারের কাছে যে সব ডেলিভারি ভালো লেগেছিল, সেগুলোই পরবর্তীতে চেষ্টা করে গেছি।’

/কেআর/

x