তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণের জন্য ১০ লাখ ডলারের বৃত্তি

হিটলার এ. হালিম ১৬:৫১ , জুলাই ১১ , ২০১৮

আবুবকর হানিপযুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার প্রযুক্তি কর্মবাজারে ইতোমধ্যে তিনি স্বনামে খ্যাত। তার হাত ধরে ৫ হাজারের বেশি তরুণ-তরুণী খুঁজে পেয়েছেন উন্নত কর্মজগৎ। একদিন যে জীবন কল্পনা করাও ছিল তাদের জন্য রীতিমতো দুঃসাধ্য, খ্যাতিমান বাংলাদেশি প্রযুক্তিবিদ আবুবকর হানিপের হাত ধরে স্বপ্নের সেই জীবনই আজ তাদের হাতের মুঠোয়। কেউ কাজ করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্টের সদর দফতর হোয়াইট হাউসে, কেউ মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর পেন্টাগনে, কেউবা আবার হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্টের গুরুত্বপূর্ণ পদে। প্রযুক্তি শিক্ষায় কোনও প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি না থাকা সত্ত্বেও জনাব হানিপের উদ্যোগের সূত্রে তারা সবাই হয়ে উঠেছেন এক একজন প্রযুক্তিকর্মী। যোগ্যতা এবং দক্ষতা কোনও দিক দিয়েই তারা পিছিয়ে নেই। আর এসব কারণেই যুক্তরাষ্ট্রে সাড়া ফেলেছে আবুবকর হানিপের (প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী) প্রতিষ্ঠান পিপল এন টেক। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরের পাশাপাশি ভারত ও বাংলাদেশেও রয়েছে পিপল এন টেকের শাখা।

গত ১০ মে যুক্তরাষ্ট্রের অরল্যান্ডোর কেনেডি স্পেস সেন্টারের স্যাটার্ন-ফাইভে কথা হয় আবুবকর হানিপের সঙ্গে। এ সময় তিনি পিপল এন টেক গড়ে তোলা, ১০ লাখ ডলারের বৃত্তি ঘোষণা, স্বপ্ন নিয়ে কথা বলেন বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে।

বাংলা ট্রিবিউন: আপনার উদ্যোগের পেছনের কাহিনি জানতে চাই। কীভাবে শুরু করলেন?

আবুবকর হানিপ: আমি যখন বাংলাদেশ থেকে ইলেক্ট্রিক্যাল ও ইলেক্ট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে লেখাপড়া শেষ করে এই দেশে (যুক্তরাষ্ট্রে) আসি তখন অনেক ‘অড-জব’ করতে হয়েছে। সে সময় আমার উপলব্ধি হয়, এদেশে পড়াশোনার বিকল্প নেই। আমি কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে মাস্টার্স করলাম ভালো জিপিএ নিয়ে। এরপরও চাকরি হলো না। অনেক ভেবেও সমস্যা  খুঁজে পেলাম না। ভেবে দেখলাম, আমার দক্ষতা আর অভিজ্ঞতাটা নেই। এর উন্নয়নে আমি অনেক সার্টিফিকেট কোর্স করে দক্ষতার উন্নয়ন করলাম। পরে অবশ্য ভালো বেতনের একটা চাকরি পাই।চাকরিতে জয়েন করার পর দেখি এফবিআইসিতে কোনও বাঙালি নেই। আমাদের দেশ থেকে আসা ভালো লেখাপড়া করা যেসব অভিবাসী অড-জব করছিল তাদের ডেকে বললাম, চাকরি কীভাবে করতে হয় আমি জানি। আমি তাদের আশ্বস্ত করলাম, দক্ষতার উন্নয়ন করে আমি তাদের চাকরির ব্যবস্থা করতে পারবো। ফলে চাকরি পাওয়া খুবই সহজ হবে। তখন কেউ কেউ আমার কথা শুনলো। তাদের নিয়ে বাসার বেজমেন্টে আমি কাজ শুরু করি। এ পর্যন্ত পাঁচ হাজার বাংলাদেশিকে ‘মেইনস্ট্রিমে’ চাকরি দিতে পেরেছি। যাদের সবাই বার্ষিক ৮০ হাজার থেকে দুই লাখ ডলার বেতনে কাজ করছেন।

এদেশে যারা কম্পিউটার সায়েন্সে ‘ব্যাচেলর’ করে তারা সর্বোচ্চ বার্ষিক ৫০ হাজার ডলারের চাকরি পেয়ে থাকে। তাদের বেতনের লেভেল বাড়ানোর জন্য অনেক বছর অপেক্ষা করতে হয়। পিপল এন টেকে চার মাসের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আমি তাদের উচ্চ বেতনের চাকরি পেতে সহায়তা করি।

এ পর্যন্ত পাঁচ হাজার বাংলাদেশিকে ‘মেইনস্ট্রিমে’ চাকরি দিতে পেরেছি। যাদের সবাই বার্ষিক ৮০ হাজার থেকে দুই লাখ ডলার বেতনে কাজ করছেন

বাংলা ট্রিবিউন: কী ধরনের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে আপনার প্রতিষ্ঠান?

আবুবকর হানিপ: আমাদের স্লোগানটিই হলো ‘নো মোর ইন অড জবস।’ লক্ষ্য হলো অড-জবসের সংখ্যা কমানো। অড-জব সাময়িক হওয়া উচিত। আমার এখানে কয়েক ধরনের কোর্স আছে। যাদের সাধারণ কম্পিউটার জ্ঞান ও ইংরেজি জানা আছে তাদের জন্য সফটওয়্যার টেস্টিং নামের একটা কোর্স আছে। যাদের আরও ভালো জ্ঞান আছে তারা ডাটাবেজ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন কোর্স করতে পারেন। যারা কম্পিউটার সায়েন্সে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর, প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ সম্পর্কে ভালো ধারণা আছে, তাদের জন্য ডেভেলপমেন্ট অপারেশনস- ডেভঅপস কোর্স অফার করি। এখানে ক্লাউড কম্পিউটিংও শেখানো হয়।

বাংলা ট্রিবিউন: ১০ লাখ ডলারের বৃত্তি সম্পর্কে জানতে চাই।

আবুবকর হানিপ: আমার এই স্লোগানে আরও বাংলাদেশি যুক্ত করতে ২০১৮ সালে ১০ লাখ ডলারের বৃত্তি ঘোষণা করেছি। এই ঘোষণার আওতায় ২৫০-৩০০ বাংলাদেশি বিনা খরচে এই কোর্সটি করতে পারবেন। বাংলাদেশে বসেও যাতে আউটসোর্সিং প্রকল্পগুলোতে কাজ করতে পারে সেজন্য আমরা বাংলাদেশেও একই ধরনের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছি। ঢাকায়ও রয়েছে আমাদের প্রশিক্ষণ সেন্টার। যারা অভিবাসনে আগ্রহী তাদের বাংলাদেশ থেকেই এসব প্রশিক্ষণ দিয়ে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করছি, যাতে করে এদেশে এসেই তারা ভালো একটি চাকরি পেয়ে যান। তাদের যেন অড-জব করতে না হয়। অড-জব দূর করবে এই ১০ লাখ ডলারের তথ্যপ্রযুক্তি বৃত্তি।

বাংলা ট্রিবিউন: কোন ধরনের কাজ আগামীতে ঘরে বসেই করা সম্ভব?

আবুবকর হানিপ: বাংলাদেশে ইন্টারনেট প্রযুক্তি এগিয়ে যাচ্ছে। ব্যান্ডউইথের গতি ক্রমশ বাড়ছে। এতে আমাদের দক্ষ জনগোষ্ঠী ইন্টারনেটের মাধ্যমে ঘরে বসে বিদেশের তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক কাজগুলো আউটসোর্স করতে পারে। যেমন, অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট, আইওএস অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট, ওয়েবসাইট তৈরি ইত্যাদি।

বাংলা ট্রিবিউন: পিপল এন টেক নামের বিশেষত্ব কী? কেন এই নাম?

আবুবকর হানিপ: বিশ্বায়নের এই যুগে প্রযুক্তিকে জীবন থেকে বাদ দেওয়া যাবে না। বরং এখন প্রযুক্তি মানুষের জীবনের একটা অংশ। এজন্য আমি বলছি ‘পিপল এন টেক’। এর মাধ্যমে আমরা বলতে চাই, মানুষকে প্রযুক্তির সঙ্গে সমন্বয় করা। আধুনিক সব প্রযুক্তির সঙ্গে মানুষের দক্ষতার উন্নয়ন করাটাই আমাদের লক্ষ্য।

অর্থকষ্টে আছেন এমন অভিবাসী, সিঙ্গেল মা, সিঙ্গেল বাবা, যারা অত্যন্ত কষ্ট করছেন তাদের আমরা বৃত্তির সুবিধা দিয়ে থাকি। যারা ছয় মাস বা এক বছরের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে এদেশে আসবেন তাদের আমরা বাংলাদেশেই এসব কোর্স করিয়ে থাকি। যাতে করে এদেশে এসে তাদের কোনও ধরনের অড-জব করতে না হয়। দেশ থেকে কোর্স করে এদেশে এসে অনেকেই ভালো চাকরিতে জয়েন করেছেন। আমাদের ওয়েবসাইটে গেলে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে।

বাংলা ট্রিবিউন: আপনাদের প্রতিষ্ঠান এ পর্যন্ত কতজনকে চাকরি দিয়েছে?

আবুবকর হানিপ: আমারা পাঁচ হাজার চাকরি দিয়েছি উত্তর আমেরিকায়। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায়। বাংলাদেশে বসেও ৫০০ ফ্রিল্যান্সার আউটসোর্সিংয়ের কাজ করছেন। তাদের জন্য আলাদা ধরনের কোর্স আছে।

বাংলা ট্রিবিউন: যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কোনও অনুমোদন রয়েছে কী এ ধরনের প্রশিক্ষণের বিষয়ে?

স্যাটার্ন ফাইভে আবুবকর হানিপ

আবুবকর হানিপ: আমাদের পিপল এন টেক যুক্তরাষ্ট্রের বোর্ড অব এডুকেশন অনুমোদিত। এতে আমরা আমাদের প্রশিক্ষণার্থীদের ডিপ্লোমা সনদ দিতে পারি। এই সঙ্গে আমরা একটি চাকরিদানকারী প্রতিষ্ঠানও। এটার মাধ্যমে আমরা চাকরিও দিতে পারি।

আমাদের ইন্সটিটিউটের কার্যক্রম এমন যে এটাই একটা কাজ। আমরা একটি সফটওয়্যার কোম্পানিও। এর ফলে আমরা প্রশিক্ষণের মধ্যেই বাস্তব জীবনের কাজের অভিজ্ঞতা দিতে পারি।

আমাদের মার্কেটিং টিম তাদের চাকরির জন্য চেষ্টা করে। অনেক কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি রয়েছে আমাদের। তাদের কাছে আমরা কর্মীদের সিভি পাঠাই। এরপর ইন্টারভিউয়ের মাধ্যমে চাকরি হয়ে থাকে।

বাংলা ট্রিবিউন: বৃত্তির জন্য কারা যোগ্য হবেন?

আবুবকর হানিপ: আমরা জানি অনেকেই আমাদের প্রশিক্ষণের ফি বহন করতে পারবেন না। এজন্য আমাদের ১০ লাখ ডলারের একটি বৃত্তি প্রকল্প আছে। অর্থকষ্টে আছেন এমন অভিবাসী, সিঙ্গেল মা, সিঙ্গেল বাবা, যারা অত্যন্ত কষ্ট করছেন তাদের আমরা বৃত্তির সুবিধা দিয়ে থাকি। আমাদের ওয়েবসাইটে গেলে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে।

যারা ছয় মাস বা এক বছরের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে এদেশে আসবেন তাদের আমরা বাংলাদেশেই এসব কোর্স করিয়ে থাকি। যাতে করে এদেশে এসে তাদের কোনও ধরনের অড-জব করতে না হয়। দেশ থেকে কোর্স করে এদেশে এসে অনেকেই ভালো চাকরিতে জয়েন করেছেন।

আমরা যাদের চাকরি দিয়েছি তাদের অনেকেরই আইটিতে উচ্চতর জ্ঞান ছিল না। তাদের প্রয়োজনীয় দক্ষতার প্রশিক্ষণ দিয়ে ভালো চাকরির জন্য প্রস্তুত তৈরি করা হয়। এরপর আমাদের মার্কেটিং টিম তাদের চাকরির জন্য চেষ্টা করে। আমাদের অনেক কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি রয়েছে। তাদের কাছে আমরা এসব কর্মীর সিভি পাঠাই। এরপর ইন্টারভিউয়ের মাধ্যমে চাকরি হয়ে থাকে।

বাংলা ট্রিবিউন: সময় দেওয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ।

আবুবকর হানিপ: বাংলা ট্রিবিউনের জন্য শুভ কামনা।   

/এইচএএইচ/চেক-এমওএফ/

x