যে কারণে কমছে না ইন্টারনেটের দাম

হিটলার এ হালিম ০৭:৩২ , নভেম্বর ০৯ , ২০১৮

ইন্টারনেট সেবাদেশে ভূগর্ভস্থ ক্যাবল সেবা তথা এনটিটিএন’র (ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক) সংখ্যা কম হওয়া এবং ব্যান্ডউইথ পরিবহনে (ট্রান্সমিশন) ইচ্ছেমতো চার্জ আরোপ করায় ইন্টারনেটের দাম কমছে না বলে অভিযোগ করেছেন ইন্টারনেট সেবাদানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। এনটিটিটিএন’র সংখ্যা বাড়ানো গেলে এ খাতে প্রতিযোগিতা তৈরি হবে। অন্যদিকে ব্যান্ডউইথ পরিবহন চার্জও কমবে। ফলে ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো আরও কম দামে ইন্টারনেট সেবা দিতে পারবে গ্রাহককে।
দেশে কাগজে কলমে ৫টি এনটিটিএন থাকলেও দুটি প্রাইভেট এনটিটিএনের কাজ দৃশ্যমান রয়েছে। একটি হলো ফাইবার অ্যাট হোম, অপরটি সামিট কমিউনিকেশন। এই দুটি অপারেটরই সারাদেশে ব্যান্ডউইথ পরিবহনের কাজ করছে। অপারেটর দুটির সক্ষমতা, অবকাঠামো নির্মাণে অপ্রতুলতা এবং কাভারেজ এরিয়া সারাদেশে না হলেও দেশব্যাপী ব্যান্ডউইথ পরিবহনে এই দুটি অপারেটরের ওপর নির্ভর করতে হয় ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে। অন্যদিকে বাংলাদেশ রেলওয়ে, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল) ও পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ- এনটিটিএনের লাইসেন্স নিলেও সেবা না দিয়ে নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অন্তত নতুন ২টি এনটিটিএন লাইসেন্স দেওয়া হলেও ব্যান্ডউইথ পরিবহন খরচ কম হবে। বিটিআরসি ২০১৩ ও ২০১৪ সালের দুটি নির্দেশনা স্থগিত করে দেশে ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক সেবা পুরোপুরি এনটিটিএন অপারেটরদের দিয়েছে।
ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, ব্যান্ডউইথ সংগ্রহ থেকে গ্রাহকের কাছে পৌঁছতে ১৬টি উপাদান বা মাধ্যম ব্যবহার হয়। এগুলোর মধ্যে ব্যান্ডউইথ একটি উপাদান। শুধু ব্যান্ডউইথের দাম কমিয়ে কখনও ইন্টারনেটের দাম কমানো যাবে না। এই ১৬টি উপাদানের মাধ্যমে গ্রাহকের কাছে ইন্টারনেট পৌঁছাতে যে পরিমাণ অর্থ ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর খরচ হয় তার মধ্যে ব্যান্ডউইথ কিনতে ব্যয় হয় মাত্র ৬-৮ ভাগ অর্থ। সবচেয়ে বেশি (৫০ ভাগের বেশি) অর্থ ব্যয় হয় ব্যান্ডউইথের ট্রান্সমিশনে। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, কেবল ব্যান্ডউইথ নয়, সবগুলো উপাদানের দাম বা খরচ আনুপাতিকহারে কমালে তবেই ইন্টারনেটের দাম কমানো সম্ভব হবে।
জানা যায়, দেশের ২৩টি শীর্ষ ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে একটি নতুন কোম্পানি গঠন করে এনটিটিএন লাইসেন্সের আবেদন করা হয়েছে। টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির চেয়ারম্যান বরাবর গত ২ অক্টোবর এই চিঠি পাঠানো হয় বলে জানা গেছে। তবে এ ব্যাপারে কোনও অগ্রগতি জানা যায়নি।
জানতে চাইলে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বৃহস্পতিবার রাতে (৮ নভেম্বর) বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আবেদন এসেছে। এখন তা জমা থাকবে। নির্বাচনের সময় এসব নিয়ে আর কোনও কাজ হবে না। নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে দেখবে আরও এনটিটিএন লাইসেন্স দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে কিনা। ইন্টারনেটের দাম কমার ক্ষেত্রে যদি বেশি এনটিটিএন লাইসেন্স দেওয়ার কোনও যৌক্তিকতা থাকে তাহলে দেওয়া হবে।’
মন্ত্রী বলেন, ‘আমার কাছে প্রমাণ রয়েছে যে, আমাদের দেশে ইন্টারনেটের দাম অনেক বেশি। যেভাবে ডাটা প্রাইসিং (ইন্টারনেটের দাম) করা হয় সেই পদ্ধতিটি সঠিক নয়। আইআইজি (ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে) থেকে কেনা হচ্ছে ব্যান্ডউইথ আর বিক্রি করা হচ্ছে ডাটা। তার মানে ব্যান্ডউইথ থেকে ডাটাতে কনভার্সনের মধ্যে যা দাঁড়ায়, তাতে ভালোভাবে মনোযোগ দেওয়া গেলে এই জায়গায় প্রচুর সুযোগ আছে জনগণকে সহায়তা করার।’ তিনি জানান, আইটিইউ (ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন)-এর কাছ থেকে ইন্টারনেটের দামের ওপর একটা কস্ট মডেলিং পাওয়া গেছে। বিটিআরসি একটা কস্ট মডেলিং দাঁড় করাচ্ছে। এটা এখন ফাইনাল স্টেজে আছে।’
মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘ইন্টারনেটের দাম কমানোর বিষয়ে প্রসেসটুকু অন্তত শেষ করতে পেরেছি। চূড়ান্ত করতে আরও কিছু সময় লাগবে। কিন্তু আমি নিশ্চয়তা দিতে পারি ইন্টারনেটের দাম কমবে। দাম কমানোর জন্য সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে বাধ্য করা হবে। প্রকৃত অর্থে মোবাইল অপারেটরগুলোর ব্যান্ডউইথ কেনা থেকে বিক্রি করা পর্যন্ত এই প্রক্রিয়ার মধ্যে যে গ্যাপগুলো রয়েছে সেগুলো আমরা চিহ্নিত করতে পেরেছি। এটা একটা বড় কাজ ছিল।’
জানা গেছে, দেশের ২৩টি শীর্ষ ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে ‘সংযোগ নেটওয়ার্ক লিমিটেড’ নামে নতুন একটি কোম্পানি গঠন করা হয়েছে। এই কোম্পানি নতুন একটি এনটিটিএন লাইসেন্স চায়। কোম্পানিটি লাইসেন্স পেলে ঢাকাসহ ঢাকার বাইরে ক্যাবল টেনে ব্যান্ডউইথ পরিবহন করবে। এছাড়া অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কাছেও ভাড়া দিতে পারবে। ফলে কম দামে ব্যান্ডউইথ পরিবহনের পাশাপাশি একেবারে তৃণমূল পর্যায়ে কম দামে ইন্টারনেট পৌঁছানো যাবে এবং ‘এক দেশ এক রেট’ ইন্টারনেট সেবা দেওয়া যাবে।
এই ২৩টি কোম্পানির একটি- অপটিম্যাক্স কমিউনিকেশন লিমিটেডের পরিচালক (টেকনিক্যাল অপারেশন) ইমদাদুল হক বলেন, ‘আমাদের আবেদনটির এখনও কোনও অগ্রগতি জানি না। ইন্টারনেট সেবায় ভ্যালু-চেইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাতে এক ধরনের একক নির্ভরশীলতা ও প্রতিযোগিতাহীনতা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে ইন্টারনেট খাতে সরকারের প্রধান দুটি অগ্রাধিকার যেমন তৃণমূলে ইন্টারনেট পৌঁছে দেওয়া এবং গ্রাহক পর্যায়ে ইন্টারনেটের দাম কমানো সন্তোষজনক জায়গায় যেতে পারছে না।’ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই নতুন কোম্পানিকে এনটিটিএন লাইসেন্স দেওয়া হলে সফল হবে বলে মনে করছেন ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো।’
ইমদাদুল হক আরও বলেন, ‘নেশন ওয়াইড আইএসপিগুলোতে পর্যাপ্ত কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন জনবল রয়েছে। লাইসেন্স ইস্যু হওয়ার পরে স্বল্পতম সময়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ সম্ভব হবে।’ তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদ্যমান এনটিটিএন কোম্পানিগুলোর অনাগ্রহ ও উচ্চমূল্যের কারণে কাঙ্খিত সেবা সম্প্রসারণ সম্ভব হচ্ছে না। ইমদাদুল হক মনে করেন, `সংযোগ নেটওয়ার্কের লাইসেন্স দেওয়া হলে দেশের বিদ্যমান ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্কের একটি রিডানডেন্সি (পরিপূর্ণতা) তৈরি হবে। একটি এনটিটিএন’র অন্তর্ভুক্তি দেশের ইন্টারনেট খাতে গতিশীলতা, সুস্থ প্রতিযোগিতা, মানসম্মত সেবা এবং ইন্টারনেটের প্রাপ্যতা বৃদ্ধি করবে।’

অারও পড়ুন: ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের ব্যবহার বাড়ছে বাসাবাড়িতে                লাইসেন্স ছাড়া ইন্টারনেট সেবা নয়

/ওআর/

x