Aarong ad on bangla Tribune
Vision  ad on bangla Tribune

শিক্ষাগুরুর শির

সালেক উদ্দিন ১২:৫৭ , মে ২৩ , ২০১৬

Salek Uddinছোটবেলায় পাঠ্য পুস্তকে পড়া কাজী কাদের নেওয়াজের কবিতা শিক্ষকের মর্যাদার শেষ দুটি চরণ ছিল এমন- ‘আজ হতে চির-উন্নত হলো শিক্ষাগুরুর শির/ সত্যই তুমি মহান উদার বাদশাহ আলমগীর’। 
কবিতায় বাদশাহ আলমগীর দূর থেকে দেখেছিলেন যে তার পুত্র ওস্তাদের পায়ে পানি ঢেলে দিচ্ছে এবং ওস্তাদ নিজেই তার পা পরিষ্কার করছেন। এতে বাদশাহ ওস্তাদকে তার অসন্তোষ এই ভাবে প্রকাশ করেছিলেন যে, তার দুর্ভাগ্য তার পুত্র এখনও শিক্ষককে সন্মান দিতে শেখেনি। তাই যদি না হবে তবে কেন সে শুধু শিক্ষকের পায়ে পানি ঢেলে দিয়েই নিজের দায়িত্ব শেষ মনে করেছে? কেন ছাত্র নিজ হাতে শিক্ষকের পা পরিষ্কার করে মুছে দেয়নি?
আর এখন দেখছি, প্রধান শিক্ষককে অপবাদ দিয়ে গণধোলাই করে জাতীয় সংসদ সদস্য চড় থাপ্পড় মেরে কান ধরে উঠবস করানোর মতো ঘটনা।
বহুল আলোচিত এই ঘটনাটি ঘটেছে রাজধানীর সন্নিকটে নারায়ণগঞ্জে। নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে সংসদ সদস্য চড় থাপ্পড় মেরে কান ধরে উঠবস করিয়েছে। অভিযোগ আছে ৮ মে স্কুলের দশম শ্রেণির বাণিজ্য বিভাগের এক ছাত্র ক্লাসে দুষ্টুমি করায় তাকে পিটুনি দেন  প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্ত। এটাকে ইস্যু করে প্রধান শিক্ষককের বিরুদ্ধের স্কুল কমিটির লোকজন কমিটি সভা করে। পরিকল্পিতভাবেই ওই সময়েই হঠাৎ করে এলাকাতে একটি গ্রুপ ছড়িয়ে দেয় যে প্রধান শিক্ষক ইসলাম ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করেছে। মসজিদের মাইকেও বিষয়টি দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়া হলে আশেপাশের লোকজন এসে স্কুল ঘিরে ফেলে  ও শ্যামল কান্তি ভক্তকে গণপিটুনি দিয়ে অবরুদ্ধ করে রাখে।
পরে স্থানীয় সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান উপস্থিত হন। তিনি শিক্ষককে চড় থাপ্পড় মারেন এবং তার সিদ্ধান্তেই স্কুলের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্ত প্রাণভয়ে নিজের অপরাধ স্বীকার করে প্রকাশ্যে ক্ষমা চান। তাকে কান ধরে উঠবস করানো হয় এবং তিনি মুচলেকা দিতে বাধ্য হন। সবশেষে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি প্রধান শিক্ষকের পদ থেকে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে।

এ প্রসঙ্গে সংসদ সদস্য সেলিম ওমানের চাতুর্যপূর্ণ বক্তব্য হলো, জনরোষ থেকে এই শিক্ষককে বাঁচাতে এ ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না। পরিস্থিতি তখন এতটাই উত্তপ্ত ছিল যে বাধ্য হয়েই সেটা করতে হয়েছে।

আরও পড়তে পারেন: শ্রেণিকক্ষ ও পরীক্ষাগারের অভাব সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে, শিক্ষকের পদ খালি ২২৫৪টি

সংসদ সদস্যের এ কথা শুনে শেখ শাদির একটি উক্তি মনে পড়ে যায়। যার মর্মার্থ হলো, ‘এমন দিন আসবে যে দিন মূর্খরা তাদের মূর্খতার জন্যে গর্ব বোধ করবে আর জ্ঞানীরা তাদের জ্ঞানের জন্য কষ্ট পাবে’।

তাই যদি না হবে তবে বাদশাহ আলমগীর যেখানে তার  পুত্র  ভবিষ্যৎ সম্রাটকে নিজ হাতে শিক্ষকের পা ধুয়ে মুছে দেওয়ার নির্দেশ দেন সেখানে আমাদের দেশের সংসদ সদস্য শিক্ষকের সন্মান রক্ষার কথা না ভেবে ছাত্র আভিভাবক জনগণের সামনে শিক্ষককে কান ধরে উঠবসের মাধমে পুরো শিক্ষক সমাজকে পদদলিত করে বলবেন, ‘এই শিক্ষককে বাঁচাতে এ ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না’!

লেখার শুরুতে কবি কাজী কাদের নেওয়াজের শিক্ষকের মর্যাদা কবিতা এ কারণেই মনে পড়েছিল যে, এক সময় স্কুল কলেজে শিষ্টাচার শেখানো হতো। সে কারণেই সমাজে শিক্ষকের মর্যাদা যে কতটুকু তা আমরা জানতাম। বিশ্বাস করতাম বাবা মার মতোই শিক্ষক আমাদের গুরুজন। গুরুজনের স্থান আমাদের হৃদয়য়ের কোন জায়গায়। এখন আর সে সব নেই। শিক্ষকও হয়ে গেছেন চাকরিজীবী হতদরিদ্র আর দশজনের মতো একজন সাধারণ মানুষ। তাইতো বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে কান ধরে উঠবস করানোকেও আমাদের সংসদ সদস্য মনে করেন সাধারণ ঘটনাই।

এ প্রসঙ্গে নারায়ণগঞ্জের এসপি বলছেন,  এটা নাকি ফৌজদারি অপরাধ নয়। ভাবখানা এমন যে, কর্তা যা করবেন সেটাতো কর্ম কারক। এখানে অপরাধের কথা আসে কেন!    

সাংসদের এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। বর্তমানে সরকারি দলের টাঙ্গাইলের এক সাংসদ হত্যা মামলায় পালিয়ে আছেন। পুলিশ তাকে খুঁজে পায় না অথবা খোঁজে না। গেল বছর অক্টোবরে, সরকারি দলের গাইবান্ধার আর এক সাংসদ  ৮ বছরের শিশু সৌরভকে গুলি করে ফেলে যায়। শুধু তাই নয় আহত শিশুটিকে হাসপাতালে নেওয়ার পথেও সাংসদের লোকজন বাঁধা দেয়। পরে সাংসদের অস্ত্রধারী বাহিনী মামলা উঠিয়ে নেওয়ার জন্য সৌরভের পরিবারকে হুমকি দেয়। তারপরও সাংসদকে গ্রেফতার করার সাহস পায়নি পুলিশ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী পর্যন্ত বলেন, ‘এমপি লিটন পলাতক’। ওদিকে, সাংসদ লিটন ঢাকায় এসে বহাল তবিয়তে তদ্বির করে যায়। মূলত দুঃসময়ে দলের জন্য ত্যাগ বিবেচনায় সরকার লিটনকে গ্রেফতার করতে সময় নেয়। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নিজেই দলের জন্য লিটনের ত্যাগের কথা এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে উল্লেখ করেন। পরে সাংসদ জামিন নিয়ে বুক ফুলিয়ে বের হয়ে আসে। ফুলের মালা দিয়ে তাকে বরণ করা হয়। বলা হয় ‘এমপি লিটন ভালো লোক, ফুলের মালা তারই হোক’।

ঘটনাগুলো স্মরণ করলাম এ কারণেই যে, প্রতিটি ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক প্রভাবশালী কর্তাকারকরা যে সব কর্ম করছেন তার সহায়ক হিসাবে কাজ করছে প্রশাসন, রাজনৈতিক পরিচয়। আর এই রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণেই এক সাংসদ ৮ বছরের শিশুকে গুলি করে ফেলে যেতে পারে। অন্য সাংসদ  প্রতিপক্ষকে হত্যা করে পালিয়ে থাকতে পারে। পুলিশ তাকে না খোঁজেও পলাতক বলতে পারে । আর এক সাংসদ প্রধান শিক্ষককে গণধোলাই করিয়ে কান ধরে উঠবস করাতে পারে এবং চাকরি থেকে বরখাস্ত করাতে পারে।

আরও পড়তে পারেন: বিএনপি দমনে মামলাকেই ‘অস্ত্র’ ভাবছে আ. লীগ

শিক্ষককে কান ধরে উঠবস করানোর ঘটনায় সাংসদ সেলিম ওসমান পার পেয়ে গেছেন ভাবতেই পারেন। কারণ ইতিহাস বলে তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্যে এটা কোনও ঘটনাই না। ইতিপূর্বে এরচেয়ে বহু বহু গুণ বড় ঘটনা ঘটিয়েও তারা পার পেয়ে গেছে। শুধু পার পেয়ে গেছে বললে ভুল হবে, বেশ ভালো আছে, দাপটের সঙ্গে প্রভাব বিস্তার করছে। হয়তো এখানেই শেষ নয় আর কিছুদিন পর দেখা যাবে এই প্রধান শিক্ষকের জন্যে আরও বড় কোনও বিপদ অপেক্ষা করছে। আপামর জনতা চিৎকার করলেও কোনও লাভ হচ্ছে না।

তবে আশার কথা হলো শিক্ষককে কান ধরে উঠবসের ঘটনায় দেশব্যাপী তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। ব্যথিত হয়েছেন সমাজের সবশ্রেণির মানুষ। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিক্ষুব্ধরা। দেশব্যাপী মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। ওসমান পরিবার শাসিত নারায়ণগঞ্জ জেলা শহরেও  মানববন্ধনে সেলিম ওসমানকে বয়কট করার দাবি উঠেছে।  একইসঙ্গে  সবার সামনে তাকেও কানে ধরে ওঠ-বস করতে হবে বলেও সেখানে দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি তাকে সংসদে প্রবেশ করতে না দিতে ও বয়কট করতে অন্য সংসদ সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

ঢাকার শাহবাগে ছাত্র-শিক্ষক-সাংবাদিক-সাংস্কৃতিক কর্মীরা সংহতি সমাবেশ করেছেন। সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে দলমত নির্বিশেষে বৃষ্টিতে ভিজে কান ধরে উঠবস করেছেন শিক্ষার্থীরা। প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের এক বিবৃতিতে এটাকে চূড়ান্ত অসভ্যতা, বর্বরতা ও বেআইনি বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। আর দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদরা বলেছেন, কানধরে উঠবস করেছেন শিক্ষক আর কান কাটা গেছে পুরো জাতির। এ ঘটনাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলেছেন আইনমন্ত্রী ।

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন,  শিক্ষককে কান ধরে উঠবসে প্রমাণ হয়, সমাজে শিক্ষকদের কোনও মর্যাদা নেই। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান  বলেন,  এই ঘটনার যদি কোনও প্রতিকার না হয়, তাহলে আমাদের মুখ দেখানোর জায়গা থাকবে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমদ বলেন, একজন শিক্ষককে সংসদ সদস্যের সামনে কানধরে উঠানো বসানোর জন্য এই সমাজটাকে ঘৃণা করা ছাড়া আমাদের আর কি করার আছে। শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন,  শিক্ষককে সম্মানিত অবস্থানে না রাখলে কোনও সমাজ টেকে না।

নারায়ণগঞ্জে শিক্ষক নির্যাতনের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হবে না জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। অন্যদিকে গঠিত  তদন্ত কমিটির দেওয়া প্রতিবেদনে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার মতো কিছুই পাওয়া যায়নি । যা পাওয়া গেছে তার প্রেক্ষিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বরখাস্তকৃত নির্দোষ প্রধান শিক্ষককে তার স্বপদে বহাল করেছে। অযোগ্যতা এবং দায়িত্বহীনতার কারণে ওই বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটি বাতিল করেছে।

শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, শিক্ষকের মর্যাদাহানি মানে পুরো জাতির মর্যাদাহানি। আমরা শিক্ষককের অমর্যাদা কোনওভাবেই বরদাস্ত করবো না। শিক্ষকের সম্মান নিশ্চিত করতে হবে। কারণ শিক্ষকরাই জাতি গড়ার কারিগর।

সেলিম ওসমান স্বদলবলে সংবাদ সন্মেলন করছেন। জোর গলায় বলছেন, ওই শিক্ষককে কান ধরে উঠবস করানোর ঘটনায় ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।

অথচ এদেশেই শেরপুর কলেজের প্রভাষককে অপমান-অসম্মান করার জন্য অপরাধীর দশ বছরের কারাদণ্ড হয়েছিল। সে বিচারের রায় বেশিদিন আগেও হয়নি যে মানুষ ভুলে গেছে। সে ঘটনাটি ছিল এমন, ১৯৭১ সালে শেরপুর কলেজের প্রভাষক আবদুল হান্নানকে অপমান-অসম্মান করেছিল যুদ্ধাপরাধী কামারুজ্জামান। যুদ্ধাপরাধী হিসেবে তার বিরুদ্ধে আনা ৭টি অভিযোগের মধ্যে এটিও ছিল একটি। এই শিক্ষকের মুখে চুন-কালি মেখে সারা শহর ঘুরিয়েছিল কামারুজ্জামানরা। এই অপরাধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কামারুজ্জামানকে দোষী সাব্যস্ত করে ১০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিল। সে বিবেচনায় শিক্ষককে কান ধরে উঠবস করানোর অপরাধের অপরাধীর শাস্তি শুধু ক্ষমা চাওয়া নয় অথবা একইভাবে কান ধরে উঠবস করাও নয় বরং এর চেয়ে বহুবহু গুণ বেশি।

যুদ্ধ অপরাধের বিচারের মতো সাহসী ও প্রশংসনীয় কাজ করেছে বর্তমান সরকার। কামারুজ্জামানকে শিক্ষক অসন্মানের ঘটনায় দশ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করাতে পেরে সরকার প্রশংসিত হয়েছে। ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি সহ দেশের সকল স্তরের মানুষ উল্লাশের মধ্যদিয়ে সমর্থন দিয়েছে, সন্তোষ প্রকাশ করেছে। আর সেই সরকারের সময়েই সরকারি জোটের নেতা শিক্ষকের গালে চড় থাপ্পড় মেরে কান ধরে উঠবস করিয়েছে। এবারও আপামর জনতা প্রতিবাদ করছে, সভা সমাবেশ করছে। মানববন্ধন করে বিচার চাইছে। তারা দেখতে চাইছে বিচার কামারুজ্জামানের জন্য এক রকম আর  সেলিম ওসমানের জন্য অন্য রকম নয়, সবার জন্যে সমান। শুধু তাই নয় সেলিম ওসমান একজন সাংসদ। এই ঘটনার মধ্যদিয়ে তিনি পবিত্র সংবিধানও লঙ্ঘন করেছেন। 

সেলিম ওসমান তথা ওসমান পরিবার মনে করতেই পারে তারা আইনের ঊর্ধ্বে। তাইতো শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ, মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রীদের কথাকে, আপামর জনতার প্রতিবাদকে তোয়াক্কা না করে দাম্ভিকতা প্রদর্শন করতে পারে। হয়তো সে মনে করছে তার বিরুদ্ধে সারাদেশ ধিক্কার দিলে দিক স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী যে ওসমান পরিবারের সদস্যদের সুরক্ষার দায়িত্বভার নিয়েছেন তিনি সেই পরিবারেরই একজন। কী হবে তার!!

লেখকঃ কথাসাহিত্যিক ও কলামিস্ট ।

Advertisement

Advertisement

Pran-RFL ad on bangla Tribune x