আড্ডার জন্য ‘কফি টাইম’ চালু করে দুই ভাই আজ রেস্টুরেন্ট উদ্যোক্তা

হিটলার এ. হালিম ০০:০০ , জানুয়ারি ০৫ , ২০১৯
যে বয়সে পড়াশোনা নিয়ে থাকার কথা, সে বয়সেই তারা হয়েছেন উদ্যোক্তা। করছেন রেস্টুরেন্ট ব্যবসা। শুরুটা ছিল একেবারে ছোট করে, পরবর্তীতে তারা চারটি রেস্টুরেন্টের মালিক। শুধু তাই নয়, প্রায় ৬০ জন তরুণের দায়িত্বও তাদের কাঁধে। বলছি রাজধানীর মিরপুরের জনপ্রিয় হয়ে ‍ওঠা কফি শপ ‘কফি টাইম’-এর উদ্যোক্তা, যমজ দুই ভাই সাইফুল ইসলাম ও মাহতাব ইসলামের কথা। এছাড়া রয়েছেন সহ-উদ্যোক্তা হিসেবে তানভীর আহমেদ।
সাইফুল ইসলাম ও মাহতাব ইসলাম
শীতের এক রাতে কফি টাইমে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে বসে গেলেন দুই ভাই। গল্পচ্ছলে বলে গেলেন তাদের উদ্যোক্তা হওয়ার কথা, স্বপ্নের কথা। জানালেন, ৩৫ বর্গফুটের এক চিলতে পরিসরে শুরু হয় কফি টাইম। এর সঙ্গেই ছিল ছোট্ট একটু কিচেন। সেখান থেকেই আজকের কফি টাইম নামের বিশাল রেস্টুরেন্ট। এই সফলতার পেছনে ছিল দুই ভাইয়ের ‘পরিশ্রম ও স্বপ্ন। স্বপ্নটা বিশাল হওয়াতেই আজ মিরপুরের মানুষের কাছে খুব জনপ্রিয় ‘কফি টাইম।’
দুই ভাইয়ের কাছে উদ্যোক্তা হওয়ার গল্প জানতে চাইলে তারা বলেন, 'তখন আমাদের পড়াশোনা ছিল শেষের পথে (দু’জনই গ্র্যাজুয়েশন করেছেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে)। সবাই শেষ সেমিস্টারে ছিলাম। তখন অনেকেই চাকরি খুঁজতে ব্যস্ত সময় পার করছিল। আমরা আড্ডা দিতাম আর ভাবতাম, এমন কিছু করা দরকার যেখানে আড্ডাও হবে, আবার ইনকামও আসবে। যেকথা সেই কাজ। সেই সেমিস্টারেই শুরু করেছিলাম ‘কফি টাইম।’ সালটা ছিল ২০১৪ সাল। মাত্র ৪ বছরেই এখন মিরপুর ও উত্তরায় রয়েছে কফি টাইমের চারটি শাখা।  
কফি টাইম নামের প্রসঙ্গে দুই ভাই বলেন, 'আড্ডা দিতাম, গল্প করতাম। ব্যবসা শুরু করবো করবো ভাবছি। তখন বিভিন্ন নাম আমাদের মাথায় আসতো। কফি গ্যারেজ, ক্যাফেইন বা কফি রিলেটেড নামগুলোই আমরা বেশি পছন্দ করতাম। এই নামগুলোই মাথায় আসতো। এখান থেকেই নেওয়া হয় ‘কফি টাইম’। নামটির একটা অর্থও আছে। আমরা আসলে ‘স্টুডেন্ট’ বয়সে চিন্তা করি, কম দামে ভালো কফি কোথায় পাওয়া যায়, যেখানে একটু আড্ডাও দেওয়া যাবে। সেটা ভেবেই এই নাম। 
শুরুতে এই ব্যবসায়ের অনভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তারা উল্লেখ করেন, প্রথমে কিভাবে অর্ডার নিতে হয়ে জানতাম না। (তখন এটি মূলত ছিল একটি পাইলট প্রোজেক্ট)। পরিকল্পনা ছিল, যদি মানুষজন আমাদের রেসিপিগুলো পছন্দ করে তাহলে কফি শপটা বড় করবো। সত্যি সত্যিই মানুষজন পছন্দও করলো! দেড় মাসের মাথায় আমরা কফি টাইমকে বড় পরিসরে নিয়ে গেলাম। এরপরে কিছু ডেজার্ট রাখার জন্য আমরা ব্রাউনি, লাভা কেক, কাপ কেক আনলাম। এভাবেই মেন্যু বড় হতে থাকলো। যোগ হলো মেক্সিকান ফুডস, সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের কাবাব, নান, সেট মিল। আর কফি টাইমের সর্বশেষ সংযোজন হলো পিৎজা। ইটালিয়ান, ম্যাক্সিকান, চাইনিজ, আফগানি খাবারও পাওয়া যাচ্ছে কফি টাইমে। 

আড্ডা থেকে উদ্যোক্তা হওয়ার কথা কেন মাথায় এলো?
একটা বিষয় আমাদের মাথায় বরাবরই ছিল, যদি কম দামে যদি কফি দেওয়া যায় তাহলে সবাই সেটা নেবে। আমরা তো অনেকদিন ধরেই দেখছিলাম মানুষ চায়ের দোকানে আড্ডা দেয়, গল্প করে, খাওয়া দাওয়া করে। সেই ২০১৪ সালে আমরা যখন শুরু করলাম তখন মিরপুরে খুব ভালো রেস্টুরেন্ট ছিল না, ভালো কফি শপ ছিল না। সব মিলিয়ে এই আড্ডা, গল্পের জায়গা থেকেই এরকম পরিকল্পনা করা। আমাদের শুরুর দ্বিতীয় দিনে এতো ভিড় ছিল যে আমরা ক্রেতাদের সামলাতে হিমশিম খাচ্ছিলাম। যখন প্রচুর অর্ডার এলে আমরা মাইক ব্যবহার করতাম। মাইকে অর্ডার নাম্বার বলে দিতাম। ক্রেতারা আসতো। সেই মাইক আমরা এখনও রেখে দিয়েছি। আমাদের কফি শপের সেই ক্যান্টিন ফ্লেভারটি এখনও আছে। ক্যান্টিন ক্যান্টিন একটা ফ্লেভার সব সময় ‘কফি টাইম’-এ রাখার চেষ্টা করছি।
 
চাকরি না খুঁজে এখন চাকরি দিচ্ছেন। বিষয়টি কেমন লাগছে? 
বিষয়টি খুব আনন্দের। প্রথমে যখন দেখলাম আমাদের কফি হাউজ জমে গেছে। অনেক মানুষ আসছে। সেসময় আমার আন্ডারে পাঁচজন লোক কাজ করতো। তার মানে আমরা পাঁচটি পরিবার চালাতে পারছি। এখন সব মিলিয়ে ৬০ জনের একটি পরিবার ‘কফি টাইম’। 
 
এতকিছু থাকতে রেস্টুরেন্ট ব্যবসা কেন?
যেহেতু আড্ডা দিতে পছন্দ করতাম। সেই আড্ডা থেকেই ছাত্র অবস্থাই প্ল্যানটা মাথায় এসেছে এবং দেখলাম আমাদের সঙ্গে রেস্টুরেন্ট বিজনেস খুব বেশি সুট করে। (এটা তারা আসলে পরিবার থেকে পেয়েছেন। তারা বাবা দক্ষিণ আফ্রিকায় রেস্টুরেন্ট ব্যবসা করছেন দীর্ঘদিন ধরে)।আরেকটি বিষয়, এখানে মানুষের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া যায়, কমিউনিকেশন করা যায়। আমাদের যোগাযোগ ভালো ছিল। অনেক লিংক হয়, আর সহজে পরিচিত হওয়া যায়। এ কারণেই এই ব্যবসায় নেমেছি। আমরা মনে করি, মানুষের বিনোদনের জায়গা নেই। বিনোদন বলতে এখন রেস্টুরেন্টকে বোঝানো হয়। দেখবেন, সন্ধ্যার পরে এখানে কেমন ভিড় হয়। এখান থেকে আমাদের ভালবাসাটা শুরু হয়েছে। এ কফি টাইম হচ্ছে আমাদের ভালো লাগার একটা জায়গা। মিরপুরের লোকজন এখন কফি টাইমকে ভালোবাসে ফেলেছে। যার নমুনা যায়, বিকেল থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত। 
আমাদের ইচ্ছা আছে একটি লাইভ কিচেন, ক্যাটারিং সার্ভিস, আর একটা মেগা কিচেন করার। যেখানে সব কিছুই লাইভ পাওয়া যাবে। ‘লাইভ কিচেন’ হলো খুব খোলামেলা একটা বড় জায়গা নিয়ে কিচেন। যেখানে রান্না-বান্না হবে গ্রাহকের সামনে তাদের পছন্দের আইটেম। সবকিছু সামনে সাজানো থাকবে। আমরা সহযোগী দিয়ে দেবো গ্রাহকরা নিজেদের মতো করে রান্না করে খেতে পারবেন।  
 
এর বাইরে? 
‘দি গ্রেট ফুড’ একটি ফ্যাক্টরি করার ইচ্ছা আছে যেখানে মানুষ সব রকমের খাবার পাবে। চাইনিজ, জাপানিজ, থাই। যেখানে থাকবে অথেনটিক ফুড। এসব নিয়ে একটি ফুড ফ্যাক্টরি চালু করার ইচ্ছা আছে। আমার মনে হয়, ফুড ডেলিভারি সিস্টেম আরও আধুনিক হওয়া উচিৎ। তবে এরকম কোনও সার্ভিস চালু করার ইচ্ছা আপাতত নেই।
আমরা ‘ফ্রি হোম ডেলিভারি সার্ভিস’ চালু করতে যাচ্ছি। নতুন বছরে এই সেবা চালু হবে। আপাতত মিরপুর এলাকায় শুরু হবে। এরপর যেখানে যেখানে আমাদের শাখা আছে সেখানেই খাবার সাপ্লাই দেব। ৩০০ টাকা অর্ডার দিলেই আমরা ফ্রি ফুড ডেলিভারি দেবো। 
 
আপনাদের আরেকটি উদ্যোগ ‘প্রিয় মেজবান।' সেটা নিয়ে যদি বলতেন। 
‘কফি টাইমের একটা বিশেষ দিক হচ্ছে নতুন নতুন খাবার খুঁজে বের করা। মানুষ কী পছন্দ করে সে দিকে খেয়াল রাখা। এরই অংশ হিসেবে দেখলাম মিরপুরের মানুষ মেজবান খেতে খুব পছন্দ করে। তখন আমরা চিন্তা করেছি মিরপুরে যদি একটা মেজবানি খাবারের রেস্টুরেন্ট করা যায়, তাহলে মানুষ খুব পছন্দ করবে। সে চিন্তা থেকেই এই ‘মেজবানি রেস্টুরেন্ট ’করা। ভালো সাড়া ফেলেছে প্রতিষ্ঠানটি। 
 
নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য আপনাদের পরামর্শ
গত চার বছরে আমাদের রেস্টুরেন্ট বিজনেস দেখে প্রায় ১০০ -এর বেশি রেস্টুরেন্ট গড়ে ওঠে মিরপুরে। সবাই কিন্তু সফল হতে পারেনি। কারণ অনেকেই জানে না কী করতে হবে।বাজারে কী ধরনের খাবার চলছে, মানুষজন কী খেতে চায় সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে। কাস্টমারকে দিয়ে হবে সর্বোচ্চ গুরুত্ব। সৎ থাকতে হবে। দিতে হবে ভালো সার্ভিস। কাস্টমারকে অতিথি হিসেবে আপ্যায়ন করতে হবে। কাস্টমার তাহলে বারবার আসবে। এই ব্যবসায়ে নামতে হলে নিজেকে একজন শেফও হতে হবে। মোটকথা, রান্না-বান্নার ব্যাপারে অনেক কিছু জানতে হবে।

এইচএএইচ/এনএ/

x