অদম্য সাইদুরের গল্প

শাহরিয়ার খান নোবেল, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯:১০ , মে ২১ , ২০১৯

পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়ানোর শক্তি নেই, হাতেও নেই লেখার শক্তি। কথা কিছুটা অস্পষ্ট। হুইল চেয়ার ছাড়া নড়াচড়ার সুযোগ নেই। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে-নামতে নিতে হয় অন্যের সাহায্য। তাতে কী? মেধা তো দমে যায়নি! আর সেই মেধার জোরেই সাইদুর রহমান পড়ছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে। হতে চান একজন গবেষক।


সাইদুর, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের স্নাতক চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। জন্ম কুমিল্লা জেলার দেবিদ্বার উপজেলায় । মাত্র ৬ মাস বয়সে টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে হারিয়ে ফেলেন পায়ে ভর করে দাঁড়ানোর ক্ষমতা আর হাতের শক্তি। সাইদুরের এই শারীরিক অক্ষমতা তাকে দমাতে পারেনি। মেধার যোগ্যতায় ভর্তি হন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখনও পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনও পরীক্ষা নিজ হাতে দিতে পারেননি। তার মুখের কথা শুনে পরীক্ষার খাতায় একজন লেখার কাজটি সম্পন্ন করেন। এভাবে পড়াশুনা চালিয়েও ফলাফলে ধরে রেখেছেন প্রথম শ্রেণী।
শুধু পড়াশোনাই নয়, বিভিন্ন সংগঠন থেকে শুরু করে কর্মশালায় সাইদুরের থাকে সরব অংশগ্রহণ। গত বছরের মার্চে বাংলাদেশ একাডেমি অব রুরাল ডেভলপমেন্ট (বার্ড) এ অনুষ্ঠিত গবেষকদের কর্মশালায় সাইদুর তার কাজের জন্য ভূয়সী প্রশংসা পান। পাশাপাশি সাইদুরের প্রবন্ধ স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় এবং জাপানের সম্মলিতভাবে আয়োজিত এক সেমিনারে প্রশংসিত হয়েছে। সাইদুরকে এগিয়ে যাবার জন্য এলজিইডির পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছে ল্যাপটপ।


তাছাড়া সাইদুর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছায়া জাতিসংঘের একজন নিয়মিত প্রতিনিধি৷ ছায়া কূটনীতির এই ক্ষেত্রটিতে রয়েছে তার দুটি পুরস্কার। কথা বলা অস্পষ্ট হলেও সাইদুর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় পোডিয়ামের একজন ‘পাবলিক স্পিকার।’ সাইদুরের বক্তব্য শুনলে অনুপ্রেরণা পাবেন যে কেউ। এছাড়াও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্পেশালী এবলড’ শিক্ষার্থীদের সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সাইদুর।
সাইদুরের এতদূর আসতে পারার পেছনে ছিল অনেক বাধা জয় করার গল্প। শুরুর দিকে সাইদুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৩৪ কিলোমিটার দূরের বাড়ি দেবিদ্বার থেকে এসে ক্লাস করতেন। পরে ওঠেন বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে। সাইদুরের দমে না যাওয়ার পেছনে সবচাইতে বেশি প্রেরণা যুগিয়েছে তার পরিবার। বড়ভাই আর মায়ের সহযোগিতায় চলে তার পড়াশোনা। কিন্তু ২০১৬ সালে বাবা মারা যাওয়ার পর সাইদুর পরড়ে যান আর্থিক অসচ্ছলতায়। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ড. আবু তাহের নিয়েছেন তার পড়াশোনার দায়িত্ব।


সাইদুরের পড়াশোনা এবং চলাফেরার কাজে সহযোগিতা করেন তার বন্ধুরা। তবে বন্ধুদের আড্ডায় সাইদুরই মাতিয়ে রাখেন সবাইকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি পরিচিত কুবির স্টিফেন হকিং হিসেবে।
তার সহপাঠী শরিফুল ইসলাম বলছিলেন সাইদুরের কথা। তার ভাষায়, ‘সাইদুর আমাদের দেখে অনুপ্রেরণা নেয় না বরং আমরা তাকে দেখে অনুপ্রেরণা পাই।’ শিক্ষকদের বিবেচনায় সাইদুর একজন অসাধারণ মেধাবী শিক্ষার্থী। তার বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ‘আমি সাইদুরসহ মোট ১৫ জন শিক্ষার্থীকে নিয়ে একটি গবেষণাবিদ্যার কোর্স পড়িয়েছিলাম। অন্য ১৪ জন স্বাভাবিক শিক্ষার্থী যে পরিসংখ্যানগুলো ধরতে পারতো না সাইদুর সেগুলো সবার আগেই ধরতে পারত। সাইদুর অসম্ভব মেধাবী। দৃঢ় আত্মবিশ্বাসের জোরেই সে তার শারীরিক অক্ষমতাকে উতরে যাচ্ছে সবসময়।’
অদম্য সাইদুর আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে জানালেন তার স্বপ্নের কথা, ‘আমি কখনও নিজেকে আলাদা ভাবি না, আমি সবার মতোই। আমি একজন গবেষক হতে চাই। আমি বৃত্তি নিয়ে দেশের বাইরে উচ্চশিক্ষা নিতে যেতে চাই৷ আমি দেশের গবেষণাখাতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই।’

/এনএ/

x