রান্না দিয়ে লাখো হৃদয় জয় করা উম্মির গল্প

নওরিন আক্তার ১৭:৩০ , জুন ২১ , ২০১৯

‘ওয়েলকাম টু মাই চ্যানেল কুকিং স্টুডিও বাই উম্মি’- রান্না নিয়ে যাদের আগ্রহ আছে তাদের কাছে খুবই পরিচিত লাইনটি। খুব সহজে রান্না শেখার জন্য লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে পরিচিত চ্যানেলটির প্রতিষ্ঠাতা উম্মি সেলিম আলিশবা। বর্তমানে উম্মির চ্যানেলের সাবস্ক্রাইবার ১২ লক্ষ। আমেরিকা প্রবাসী উম্মি দেশে এসেছেন সম্প্রতি। ভক্তদের সঙ্গে সামনাসামনি দেখা করার জন্য রাজধানীর একটি রেস্টুরেন্টে আয়োজন করেছিলেন গেট টুগেদার পার্টির। সেখানেই সময় দিলেন বাংলা ট্রিবিউনকে।

উম্মি সেলিম আলিশবা
কীভাবে রান্না নিয়ে কাজ শুরু? জানালেন রান্নাবান্না নিয়ে আগ্রহ ছিল সবসময়ই। ঈদের সময় ডেসার্ট রান্না করতেন শখ করে। মাকে সাহায্য করতেন রান্নার কাজে। স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার পর পুরো সময়টুকু দিয়েছিলেন রান্নাতে। তবে তখনও ভাবেননি একসময় লক্ষ লক্ষ মানুষের রান্নাঘরে পৌঁছে যাবেন সাহায্যকারী হয়ে! ২০১২ সালে আমেরিকা চলে যান স্বামীর সঙ্গে। সেখানে সাহায্যকারীর অভাব ছিল। আবার স্বামী পছন্দ করতেন নতুন নতুন খাবার খেতে। সব মিলিয়ে হাতে তুলে নেন রান্নার দায়িত্ব। তখন আরও একবার নতুন করে রান্নার বিষয়ে আগ্রহ জন্মায় উম্মির। সেই আগ্রহ থেকেই খুলে ফেলেন চ্যানেল। ২০১৫ সালে কুকিং স্টুডিও বাই উম্মি’র পথচলা শুরু হয়। একজন দুইজন করে এখন ১২ লক্ষ পরিবারে পরিণত হওয়া চ্যানেলটিতে পাওয়া যাচ্ছে নিত্য নতুন রেসিপি। বিয়েবাড়ির খাবার থেকে শুরু করে ডেজার্ট, স্ন্যাকস, স্বাস্থ্যকর সব খাবার উম্মি বানিয়ে ফেলেন এক নিমিষেই। ভিডিও দেখে আপনার মনে হতে বাধ্য যে রান্না আসলে খুবই সহজ একটি কাজ!

উম্মি সেলিম আলিশবা
কীভাবে এত সব মজার মজার রান্না এত সহজে করে ফেলেন উম্মি? ‘কোনও রেসিপি নিয়ে কাজ করার আগে সেটা সম্পর্কে খুব ভালোভাবে জেনে নিই। তারপর বিভিন্ন ব্লগ পড়ি সে সংক্রান্ত। অনেক ভিডিও দেখি। তারপর নিজের মতো করে রান্নাটি করি। অনেক সময় এমন হয় যে, একটি দুটি উপকরণ বদলে ফেলার কারণে খাবারের স্বাদ বদলে গেছে রাতারাতি। আবার অনেক সময় কিছুতেই মনের মতো স্বাদ আসে না। অনেক নিরীক্ষার পর যখন সবকিছু পারফেক্ট মনে হয়, তখনই দর্শকদের জন্য ভিডিও প্রস্তুত করি’- বলেন উম্মি সেলিম আলিশবা। রান্নার কাজটি যেন কারোর কাছে কঠিন মনে না হয় সেজন্য উম্মি চেষ্টা করেন বিকল্প উপকরণের খোঁজ দিয়ে দিতে। যেমন আটার বদলে ময়দা দিয়েও অনেক সময় একই খাবার রান্না করে ফেলা যায়। এটা জানা থাকলে খুব বেশি ঝক্কি পোহাতে হয় না উপকরণ নিয়ে।  

স্বামী ও একমাত্র সন্তানের সঙ্গে উম্মি
খুবই আনন্দ নিয়ে রান্না করেন উম্মি। চেষ্টা করেন এই আনন্দ যেন ছুঁয়ে যায় তাদেরকেও যারা তার চ্যানেল অনুসরণ করে রান্না করছেন। এ কারণেই খুব সহজ ধাপে বুঝিয়ে বলতে চেষ্টা করেন রান্নার প্রতিটি বিষয়। ব্যক্তিগতভাবে স্ন্যাকস ও বিভিন্ন ধরনের বাঙালি খাবার রান্না করতে ভালোবাসেন এই রন্ধনশিল্পী।
রান্নার ভিডিও করার জন্য উম্মির বাসায় রয়েছে আলাদা সেটআপ। তবে শুরুতেই এতকিছু ছিল না। ধীরে ধীরে কাজ করতে করতে জেনেছেন অনেক কিছু, শিখেছেন ভিডিও বিষয়ক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ টিপস। শুরুতে সাবস্ক্রাইবার নিয়ে একেবারেই ভাবতেন না উম্মি। কেবল মন দিয়ে রান্না করে গেছেন। কীভাবে প্রতিটি বিষয় সহজ করে সবার সামনে উপস্থাপন করা যায় সেটা নিয়ে ভেবেছেন। একসময় এই বিষয়টিই তাকে আলাদা করে তুলেছে অন্যান্য রন্ধনশিল্পীদের থেকে।

ভক্ত ও দর্শকদের সঙ্গে উম্মি
ইউটিউব চ্যানেল থেকে উপার্জন কেমন হয়? উম্মি জানালেন এটা আসলে নির্ভর করে কনটেন্ট ও দর্শকদের সাড়ার উপরে। চ্যানেলে যদি অনেক ভিডিও থাকে এবং দর্শক বেশি হয়, তবে নুন্যতম ১ হাজার ডলার উপার্জন করা যায় মাসে। তবে ইউটিউবে নির্দিষ্ট উপার্জন বলে কিছু নেই। এটা যেকোনও সময়ই বাড়তে বা কমতে পারে। অনেকেই মনে করেন যত দর্শক দেখবে, ইউটিউবে তত উপার্জন। এটা ঠিক নয়। ইউটিউবের পুরো উপার্জনটাই আসে বিজ্ঞাপন থেকে। আর বিজ্ঞাপন আসা নির্ভর করে চ্যানেলের সাবস্ক্রাইবার ও কনটেন্ট কতজন দর্শক দেখছেন তার উপর।  

উম্মি
নতুন ইউটিউবারদের জন্য বেশকিছু পরামর্শ দিলেন উম্মি। শুরুতেই উপার্জনের আশা করে কেউ যদি চ্যানেল খোলেন, তবে তার ঝরে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। সফল হতে চাইলে ধৈর্য্য ও পরিশ্রমের বিকল্প নেই। শুরু থেকে কনটেন্ট কীভাবে ভালো করা যায় সেটা নিয়ে চিন্তা করতে হবে। ধীরে ধীরে দর্শকদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়লে উপার্জন আপনাতেই বাড়বে। সবচেয়ে বড় কথা কাজকে ভালোবাসতে হবে। ভালোবেসে কাজ করলে সেখানে সাফল্য আসবেই। শুরুতেই যে লাখ টাকা দামের সেটআপ লাগবে এমন নয়। মোবাইল দিয়ে ভিডিও করেও কনটেন্ট বানানো যায়।    
ভালোবাসার স্মৃতি শেয়ার করলেন বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে। প্রায় ৭ বছর পর দেশে ফিরে বসুন্ধরা শপিংমলে গিয়েছিলেন কয়েকদিন আগে। সেখানে তার চ্যানেলের একজন দর্শক তাকে চিনে ফেলেন। ‘তিনি বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না যে আমি রক্ত-মাংসের তৈরি একজন সাধারণ মানুষ! আমাকে ছুঁয়ে দেখতে গিয়ে জড়িয়ে ধরলেন। তার পাশাপাশি আমার চোখেও পানি এসে গিয়েছিল। এই ভালোবাসাগুলো অমূল্য এবং এগুলোই আমার ভালো কাজের অনুপ্রেরণা’- বলেন উম্মি সেলিম।  
বাংলা ট্রিবিউনের পাঠকদের জন্য কিছু কুকিং টিপস দিয়ে দিয়েছেন উম্মি।

  • করলা রান্নার সময় ঢাকনা দেওয়া যাবে না। চুলার জ্বাল বাড়িয়ে ঢাকনা ছাড়া রান্না করলে করলার রঙ যেমন সুন্দর থাকে, তেমনি তিতকুটে ভাবটাও কমে আসে।
  • কাবাব ব্রেডক্রাম্বে গড়িয়ে তেলে ভাজলে তেল কালো হয়ে যায়। ফলে এই তেল আর ব্যবহার করা যায় না। কাবাব ভাজার আগে ছোট এক টুকরা গাজর তেলে ছেড়ে দিলে আর কালো হবে না তেল।
  • অনেক সময় তরকারিতে লবণ কিংবা হলুদ বেশি পড়ে যায়। সেক্ষেত্রে আটার ছোট একটি দলা তরকারিতে দিয়ে দিলে বাড়তি লবণ বা হলুদ দূর হয়ে যাবে।

ছবি: সাজ্জাদ হোসেন

 

/এনএ/

x